চাঁদ পর্যবেক্ষণ পরিষদ বাংলাদেশ
এর তথ্যমতে এখন, মুতাবিক, , রোজ , সময় মিনিট

ডিজিটাল ছবিও হারাম কেন?

‘তাসবীর’-এর শাব্দিক অর্থ ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

তাসবীর (تصویر) শব্দটি বাবে তাফঈল باب تفعیل [এর মাসদার (مصدر) এবং সূরত (صورت) শব্দ থেকে নির্গত। আরবী শব্দ প্রকরণ শাস্ত্র অনুযায়ী এটি সপ্ত প্রকারের মধ্য হতে আজওয়াফ (جوف।) শ্রেণিভুক্ত। কোনো কল্পিত ও ধারণাশ্রিত বিষয়কে যেমন তাসবীর (تصوير) বলা হয়, তদ্রুপ কোনো বস্তুগত (مدي) জিনিসের আকৃতি ব্রেনের ভেতর নিয়ে আসাকেও তাসবীর (تصویر) বলা হয়। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, এটি তার চূড়ান্ত রূপে পৌঁছুতে হবে। (مجسمة) মূর্তি, প্রতিমা। প্রস্তর বা ধাতু নির্মিত প্রতিকৃতিকে সূরত (صورت) এজন্যেই বলা হয় যে, শিল্পী, ভাস্বর বা চিত্রকর যাই বলুন, তিনি সর্বপ্রথম কোনো বস্তুর কল্পনা করেন, এরপর সেই মুতাবেক (মূর্তি, প্রতিমা) তৈরি করেন। যখন তিনি তাকে চূড়ান্ত রূপ দেন, তখন তাকে সূরত (صورت) বলা হয়। কাজেই কেমন যেনো সূরত (صورت) ও মিসাল (مثل) আভিধানিক অর্থের বিচারে সমার্থবোধক বা কাছাকাছি অর্থবোধক।

এভাবে যে, উভয়টির মাঝে স্থানান্তর পাওয়া যায়। যেমন, مثل فلان ওই সময় বলা হয়, যখন ব্যক্তি তার স্থান থেকে সরে যায়। صار الأمر এর অর্থ ঠিক তাই। এ কারণে পাথর ইত্যাদির খোদাই করা প্রতিমূর্তিকে [مجسمة ] মুজাস্সামাহ ও বলা হয়, তিমসালও বলা হয়, আবার صورت [সূরত]ও বলা হয়। শায়খ আবূ হাতেম ইবনে হামদান রাযী [মৃত ৩২২ হি.] তাঁর অনবদ্য রচনা الزينة في الكلمات الإسلامية العربية আযযীনাহ ফিল কালিমাতিল ইসলামিয়্যাতিল আরাবিয়্যাহ এর باب المصور (বাবুল মুসাওয়ার) অধ্যায়ে লিখেছেন,

وتكون الصورة معناها المثال، ومنها قيل للتماثيل تصاوير، لأنها مثلث على مثال الصور، فكان كل أمر اذا انتهى إلى غايته وتمامه ظهرتصورته وبرز مثاله ويقال : كيف صورة هذا الأمر ؟ أ: كيف مثاله ؟ –

ص : ٥٩ الجزء الأول مطبوعة القاهرة من ١٩٥٧

লেখক সেই অর্থ ও ব্যাখ্যা আরো স্পষ্ট করে তুলতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লামের হাদিস إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلى صُورَته এর ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, فلما صارت إلى التمام والغاية ابرزها تامه فسماها صورة لأنها صارت

مثالا تاما – ص :٦١

অর্থাৎ যখন হযরত আদম আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালামের সৃষ্টি তার চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে, তখন তার ওপর সূরত (صورت) শব্দের প্রয়োগ যথাযথ হয়। যেহেতু এই সূরত (صورت) খুবই দৃষ্টিনন্দন ছিলো আর আল্লাহ তা’আলার নীতিই হলো, তিনি প্রতিটি সুন্দর জিনিসের সম্বন্ধ নিজের দিকে যুক্ত করেন, এজন্যে তিনি বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلَى صُورته কারণ হলো,

لأنه ينسب إلى الله عز وجل من كل شيئ أشرفه وأفضله فكانت صورة آدم أحسن الصور وأشرفها.

– ج : ١ ، ص : ٦٠

الله مصور এর কারণ দর্শিয়ে তিনি লিখেছেন,

فسمي عز وجل نفسه مصوّرا، لأنه ابتداء تقدير الخلائق في الدنيا، وهو يتممها حتى تصير إلى غاياتها التي خلقت لها في الآخرة، فتظهر صور الخلائق التي صارت إليها فهو المصور جل وتعالى، لا صورة له، لأنه خالق الصور، ولأنّه لا غاية له ولا مثال، بل هو منشئ الصور والأمثلة في غاياتها تبارك الله والمصور.

এর বিপরীতে যখন ব্রেনের ভেতর কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জিনিসের কল্পনা করা হয়, তখন তার ওপরও সূরত (صورت) শব্দের প্রয়োগ হয়। মানতিক, দর্শন শাস্ত্রের রথি-মহারথি এমনকি উলামায়ে কেরামের কাছেও একটি জ্ঞানসম্পর্কিত পরিভাষা হিসেবে সূরত (صورت) শব্দটির অর্থ সুবিদিত। যার সারকথা হলো, শাব্দিক, পারিভাষিক ও শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে সূরত (صورت) ও তিমসাল (ال) শব্দদু’টি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত অর্থ ও বোধ লালন করে।

কাগজ, কাপড় বা অন্য কোনো জিনিসের ওপর অঙ্কিত আকৃতিকেও সূরত (صورت) ও তিমসাল [১] বলা হয়। তা প্রাণবিশিষ্ট হোক বা না হোক; কোনো পার্থক্য নেই।

উক্ত আলোচনার সমাপ্তি টেনে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, তাসবীর (تصویر) শব্দটির শাব্দিক অর্থ ও পারিভাষিক সংজ্ঞার ওপর গভীরভাবে চিন্তা করলে এই কথা স্পষ্ট হয় যে, প্রিন্টের ছবি আর স্ক্রীনের ওপর দৃশ্য ছবির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়টির বিধান এক। আর তা হলো, নিষিদ্ধ তাসবীর (تصویر) এর মাঝে উভয়টি অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

আমরা যখন আলোচিত মাসআলাটি নিয় বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হই, তখন দেখতে পাই যে, তারাও আমাদের সাথে একমত হয়েছেন। তাদের বক্তব্যও হলো যে, ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবি আর হাতে আঁকা ছবির মধ্যে কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। এখানে আমরা দু’জন বিজ্ঞান বিশ্লেষকের গবেষণা পেশ করছি। একজন হলেন, জনাব আলীম আহমাদ সাহেব। তিনি করাচি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘গ্লোবাল সাইন্স’-এর প্রধান সম্পাদক।

ফটো তোলা অথবা ফটোগ্রাফি (Photografhy)-এর অধীনের ডিজিটাল উপকরণ যেমন সিডি, ফ্লপিডিস্ক এবং হার্ডডিস্ক প্রভৃতির ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিদ্যার বিশ্লেষণ নিম্নে তুলে ধরছি:

১. প্রথম যুগের ক্যামেরা আবিস্কার করার সময় ইমেজ ফরমেশন (Image Formation)-এর যেই মৌলিক বৈজ্ঞানিক মূলনীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল, আজকের ডিজিটাল ক্যামেরাই বলেন বা প্রচলিত অন্য কোনো ক্যামেরার কথাই বলেন, সবখানে ইমেজ ফরমেশনের সেই মৌলিক বৈজ্ঞানিক মূলনীতি কাজ করছে। অর্থাৎ ইমেজ ফরমেশনের মৌলিক নীতিমালার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আসেনি। সময়ের সাথে সাথে ক্যামেরায় ইমেজের অবস্থানের বৈশিষ্ট্যে অবশ্যই পার্থক্য এসেছে, কিন্তু তার কাজের পেছনের দিক, গঠনপ্রকৃতির মূল কাঠামো এখনও সেটাই রয়ে গেছে, যা আজ থেকে এক শ’ বা সোয়া শ’ বছর পূর্বে যেমন হয়ে থাকতো।

২. প্রাথমিক যুগে ক্যামেরায় তোলা ইমেজ সংরক্ষণ করার কাজ ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর সরাসরি করা হতো। আর আজকালকের সচরাচর ব্যবহৃত ক্যামেরায় তোলা ছবি ফটোগ্রাফিক ফিলোর ভেতর সংরক্ষণ করা হয়। ক্যামেরায় বসানো ফটোগ্রাফিক ফিল্মের ওপর একটি বিশেষ ধরণের রসায়নিক পদার্থের নিচে বসানো হয়, যেগুলো খুবই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দানা (Grains)-এর আকারে হয়। যখন ক্যামেরার ভেতর প্রবেশ করা আলো সেই দানার ওপর পড়ে তখন এই দানাগুলো নিজেদের রসায়নিক পদার্থ বদলে নেয় আর এভাবে ইমেজটি সেখানে সংরক্ষিত হয়ে যায়।

ভিডিও ক্যামেরা আর আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরায় ইমেজ তৈরি কারী আলোকে ইলেক্ট্রিক সিগনাল (Electronic Signals)-এ পরিবর্তন করে তার সাথে যুক্ত ইলেক্ট্রম্যাগনিক টেপ (Electromagnetic Tape) যথা, ভিডিও টেপ অথবা অন্য কোনো মাধ্যম যেমন, ফ্ল্যাশ, মেমোরি অথবা ডাস্টের ওপর ডিজিটাল অবস্থায় সংরক্ষণ করে নেয়া হয়।

৩. ভিডিও ক্যামেরা অথবা ডিজিটাল ক্যামেরায় সংরক্ষিত ইমেজ যদিও গঠনপ্রণালী অথবা বাহ্যিক বিবেচনায় ছবি হয় না, কিন্তু অর্থগত ও সদৃশ্যগতভাবে সেটি ইমেজই হয়ে থাকে। এর ব্যাখ্যা হলো, যখন ইমেজ প্রকাশ করার সময় হয়, তখন তাকে প্রথমে ঠিক যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, ঠিক সেই ইমেজের আকারেই প্রকাশিত হয়। অন্য কোনো সূরতে প্রকাশিত হয় না। এ কারণেই বিজ্ঞানের বিশেষ পরিভাষায় সেই কোট্স (Codes)-এর ভেতর লুকায়িত ইমেজকে ইমেজই বলা হয়।

৪. উক্ত থিউরি আরেকটু খোলাসা করে বলছি। আজকাল ডিজিটাল ক্যামেরায় ধারণকৃত স্থির ও সচল চিত্র একটি বিশেষ ধরণের কোডস (Codes) বা ফরমেট (Farmats)-এর আকারে সংরক্ষণ করা হয়। যেমন, mpeg, tiff, bmp, wmf, jpeg, gif ইত্যাদি। যখন এই ফরমেটে ধারণকৃত তথ্য প্রকাশ করার সময় হয়, তখন সেটি একমাত্র ছবির আকারেই প্রকাশিত হয়। যদি তাকে অন্য কোনো আকারে প্রকাশ করার চেষ্টা করাও হয়, তাহলে প্রথমত সেটি তো প্রকাশ হবেই না। আর যদি প্রকাশিত হয়ও, তাহলে নির্ঘাত অর্থহীন ও অপক্ষেত্র রূপে দেখা ইমেজকে খোদ কম্পিউটারের নিজস্ব ভাষাতে ছবিই বলা হয়, অন্য কিছু যাবে। যার দ্বারা এটাই বুঝে আসে যে, ডিজিটাল মাধ্যমে ধারণকৃত নয়।

৫. কোনো ইমেজ প্রকাশ করার তৃতীয় ও সর্বশেষ স্তর হলো, ফটোগ্রাফিক প্লেট/ফিল্ম, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক টেপ অথবা কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত যে কোনো ইমেজ চূড়ান্ত স্তরে এসে বাহ্যিক ও অর্থগত, উভয়দিক বিবেচনায় ইমেজই হয়, চাই সেটিকে টিভি স্ক্রীনে প্রকাশ করা হোক অথবা কম্পিউটার মনিটরে প্রদর্শণ করা হোক, কিংবা সাধারণ কাগজে ছাপা হোক কিংবা ফটোগ্রাফিক পেপারে প্রিন্ট দেয়া হোক।

৬. এক্ষেত্রে একটি বেশ বড় ও ব্যাপক ভুল সংশোধন করা সঙ্গত মনে করছি। অনেকে মনে করে, কম্পিউটারে সকল কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়ে যায়। এটি কোনোভাবেই ঠিক নয়। কম্পিউটার তার নিজের কোনো কাজ নিষ্পন্ন করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম নয়। বরং কোনো মানুষের পক্ষ থেকে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী (যাকে পরিভাষায় কম্পিউটার প্রোগ্রাম বলা হয়) মানুষের আবিস্কৃত যন্ত্র ও উদ্ভাবিত মাধ্যমের সাহায্যে কাজ করে কোনো পরিণতি পেশ করে।

৭. সবশেষে একটি কথা স্পষ্ট করে দেয়া সমীচিন মনে করছি। তা হলো আমরা এতোক্ষণ যেই সব পরিভাষা ব্যবহার করেছি, এর সবগুলোই সাইন্সি ও টেকনিক্যাল পরিভাষা। কাজেই তার থেকে সেই বোধও বেরিয়ে আসবে, যা সাইন্স সম্মত হবে। কাজেই এমন কোনো পরিভাষা যদি দ্বীনি কোনো পরিভাষার সাথে সদৃশ্য রাখ, তাহলে তাকে কখনই দ্বীনি পরিভাষায় বিকল্প মনে করা যাবে না। (৪/৫/২০০৪ ঈ.)

তাসবীর বা প্রতিচ্ছবি, যাকে সাধারণ পরিভাষায় ফটোগ্রাফি () বলা হয়, তাকে অবশ্যই তিনটি স্তর অতিক্রম করে আসতে হয়।

প্রথমটি হলো, ইমেজের ধারণ বা ফরমেশন (Formation)।

দ্বিতীয়টি হলো, ধারণকৃত ইমেজের সংরক্ষণ বা প্যারসিসটন্স (Persistence)।

তৃতীয়টি হলো, ইমেজের প্রকাশ বা প্রেজেন্ট্যাশন (Presentation)।

প্রথম যুগের ক্যামেরা আবিস্কার করার সময় ইমেজ ফরমেশন (Image Formation)-এর যেই মৌলিক বৈজ্ঞানিক মূলনীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল, আজকের ডিজিটাল ক্যামেরাই বলেন বা প্রচলিত অন্য কোনো ক্যামেরার কথাই বলেন, সবখানে ইমেজ ফরমেশনের সেই মৌলিক বৈজ্ঞানিক মূলনীতি কাজ করছে। অন্যভাবে বললে, ইমেজ ফরমেশনের মৌলিক নীতিমালার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আসেনি। চাই সচরাচর প্রচলিত ক্যামেরা দিয়েই ছবি তোলা হোক অথবা ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করা হোক।

এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আয়না বা পানিতে তৈরি ছবি আর ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণকৃত ছবি পরষ্পরে ভিন্ন।

আয়না বা পানিতে তৈরি ছবি স্ক্রীন (Screen)-এ প্রদর্শণ করা যায় না। এজন্যে তাকে ভার্চুয়াল ইমেজ (Virtual Image) ও বলা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে ক্যামেরায় তোলা ছবি পর্দায় প্রদর্শণ করা যায়। এ কারণে তাকে

রিয়‍্যাল ইমেজও (Real Image) বলা হয়।

এখানে স্ক্রীন (Screen) বলতে উদ্দেশ্য হলো, এমন কোনো ফিজিক্সিয়াল (Physical) মাধ্যম, যার ওপর ইমেজ প্রদর্শণ করা যায়। যেমন, ফটোগ্রাফিক প্লেট অথবা ফটোসেনসেটিভ ডটস (Photosensitive Diodes) সমৃদ্ধ সিসিডি স্ক্রীন (CCD Screen) ইত্যাদি।

দ্বিতীয় যে বিষয়ের কথা বলা হলো অর্থাৎ ধারণকৃত ইমেজের সংরক্ষণ বা প্যারসিসটন্স (Persistence)। সময়ের সাথে সাথে এটি বদলাতে থাকে। প্রথম দিকে এই কাজটি সরাসরি ফটোগ্রাফিক প্লেট বা ফটোগ্রাফিক ফিল্মের ওপর সরাসরি করা হতো। প্রচলিত ক্যামেরায় এখনো সেই পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।

ক্যামেরায় বসানো ফটোগ্রাফিক ফিল্মের ওপর একটি বিশেষ ধরণের রসায়নিক পদার্থের তলানি বসিয়ে দেয়া হয়। যা খুবই খুবই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দানা (Grains) এর আকারে হয়ে থাকে। যখন ক্যামেরার ভেতর প্রবেশ করা আলো এই দানার ওপর পড়ে তখন এই দানাগুলো তার রসায়নিক পদার্থ বদলে ফেলে। আর এভাবে তার ওপর ইমেজটি সংরক্ষিত হয়ে যায়।

ভিডিও ক্যামেরা আর আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরায় প্রবেশকারী আলোকরশ্মির ইলেক্ট্রিক সিগনাল (Electronic Signals)-এ পরিবর্তন করে তার সাথে যুক্ত ইলেক্ট্রোম্যাগনিক টেপ (Electromagnetic Tape) যথা, ভিডিও টেপ অথবা অন্য কোনো মাধ্যম যেমন, ফ্ল্যাশ, মেমোরি অথবা ডাস্টের ওপর ডিজিটাল অবস্থায় সংরক্ষণ করে নেয়া হয়।

ভিডিও ক্যামেরা অথবা ডিজিটাল ক্যামেরায় সংরক্ষিত ইমেজ যদিও গঠনপ্রণালী অথবা বাহ্যিক বিবেচনায় ছবি হয় না, কিন্তু অর্থগত ও সদৃশ্যগতভাবে সেটি ইমেজই হয়ে থাকে। এর ব্যাখ্যা হলো, যখন ইমেজ প্রকাশ করার সময় হয়, তখন তাকে প্রথমে ঠিক যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, ঠিক সেই ইমেজের আকারেই প্রকাশিত হয়। অন্য কোনো সূরতে প্রকাশিত হয় না। এ কারণেই বিজ্ঞানের বিশেষ পরিভাষায় সেই কোর্স (Codes) এর ভেতর লুকায়িত ইমেজকে ইমেজই বলা হয়।

তৃতীয় যে স্তরের কথা বলা হলো, সেটি হলো ইমেজের প্রকাশ বা প্রেজেন্ট্যাশন (Presentation)। ফটোগ্রাফিক প্লেট বা ফিল্ম, ইলেক্ট্রিক সিগনাল (Electronic Signals) অথবা কেনো ডিজিটাল মাধ্যম (Digital Medium) এ সংরক্ষিত কোনো ইমেজ যখন প্রকাশ করার স্ত রে পৌঁছে, তখন সে বাহ্যিক ও মৌলিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিই হয়ে যায়। চাই তাকে টিভি স্ক্রীনে প্রদর্শন করা হোক, বা কম্পিউটার মনিটর অথবা ফটোগ্রাফিক পেপারে বের করা হোক।

এখানে একটি কথা খোলাসা করা সঙ্গত মনে করছি যে, টিভি স্ক্রীন অথবা কম্পিউটার মনিটরে যেই ইমেজ তৈরি হয়, যদিও সেটি বিন্দু (Dots) আর পিক্সেল (Pixols)-এর সমষ্টির মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু বিন্দু (Dots) আর পিক্সেল (Pixols) এর এই ধারণা নতুন কিছু নয়। যদি সাধারণ ছবি অর্থাৎ কাগজে মুদ্রিত ছবির ব্যাপারটি ধরা হয়, তাহলে তাকেও অনেকগুলো বিন্দুর সমষ্টি বলতে হবে। তাকেই যখন কম্পিউটারের স্ক্রীনে প্রদর্শন করা হবে, তখন সেই বিন্দুকে পিক্সেল বলা হবে। এছাড়া কম্পিউটার স্ক্রীনে প্রকাশিত ছবিকে কাগজের ওপর সেভাবেই প্রিন্ট দেয়া যায় যেভাবে সাধারণ কোনো ছবিকে কাগজে ফুটিয়ে তোলা যায়। কাজেই সারকথা হলো, প্রদর্শণের সময় ডিজিটাল ছবি আর সাধারণ ছবির মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না।

ফটোকে আয়নার ওপর কিয়াস করা ভুল

অনেকের ধারণা হলো, হাত দিয়ে আঁকা ছবি তৈরি করা ও ঘরে রাখা হারাম। কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে ফটো তোলা ও সে ছবি ঘরে রাখা হারাম নয়। তারা এ দলিল পেশ করে যে, ফটো আয়নারই মতো এক ধরণের প্রতিবিম্ব।

হযরতুল আকদাস মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এটি একটি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ অনুমান। কেননা আয়নার ক্ষেত্রে ব্যক্তি যখন আয়নার সামনে থেকে সরে যায়, তখন তার প্রতিবিম্বও চলে যায়। পক্ষান্তরে ফটোর ভেতর সেই দৃশ্য থেকে যায়, রয়ে যায়। দ্বিতীয় কথা হলো, আয়নার ভেতর মানবীয় শিল্পের দখলদারিত্ব নেই। অথচ ফটোর ভেতর মানবসৃষ্টি ক্যামেরা -অর্থাৎ ফটো তোলার যন্ত্রের হাত রয়েছে। কাজেই হাতে তৈরি ছবির ক্ষেত্রে যে বিধান প্রজোয্য, ক্যামেরার ফটোর ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিধান প্রজোয্য হবে।

-ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৪/২৫৩

عن أبي مالك الأشعري قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَيَشْرَبَنَّ نَاسِ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْر يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمَهَا، يُعْزَفَ عَلَى رُءُوسِهِمْ بِالْمَعَازِفِ وَالْمُغَنِّيَانِ يخسف الله بهِمُ الْأَرْضِ، وَيَجْعَل مِنْهُمْ الْقِرَدَةِ وَالْخَنَازِير . ــ السنن لابن ماجة

হযরত আবূ মালেক আশ’আরী রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, শীঘ্রই আমার উম্মতের একদল লোক মদের নাম বদলে তা পান করবে। তাদের সম্মুখে গায়িকারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গান করবে। আল্লাহ তা’আলা এ লোকগুলোকে মাটির নিচে ধসিয়ে দেবেন আর তাদের কিছু লোকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও করে পরিণত করে দেবেন। [সুনানে আবূ দাউদ, ইবনে মাযাহ শরীফ]

দোজাহানের সর্দার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ সম্পর্কে এই উম্মতের একদল লোকের অপকৌশল বের করার যেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আজ শুধু সেই মদ কেন্দ্র করেই নয়, বরং আরো অনেক হারাম জিনিসের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করছে। শরীয়ত কোনো জিনিসকে যেই নামে হারাম করেছে, তার ওপর নতুন সমাজের নতুন রং আর নতুন লেবেল সেটে, নাম বদলে দিয়ে বিনাভয়ে দেদারছে ব্যবহার করছে। আর তারা মনে মনে ভাবছে যে, এই কটকৌশল তাদেরকে খোদায়ী পাকড়াও থেকে বাঁচিয়ে দেবে। অথচ বাস্তবতা হলো,

کارها با خلق آری جمله راست

با خدا تزویر و حیلہ کے رواست

যদি তারা একটি গভীর দৃষ্টিতে দেখতো, তাহলে তাদের চোখে ফুটে ওঠতো যে, আসলে তাদের এই অপকৌশল তাদেরকে একটি গুনাহ থেকে বাঁচানোর পরিবর্তে দু’টি গুনাহে লিপ্ত করে দিয়েছে। এখন তারা দু’ভাবে অপরাধী। একটি হলো খোদ গুনাহে লিপ্ত হওয়ার অপরাধ। আর দ্বিতীয়টি হলো, তার ওপর কোনো প্রকার অনুশোচনাবোধ সৃষ্টি না হওয়া এবং প্রায়শ্চিত্ত করা থেকে উদাসীন হওয়া। মদের নাম এলকোহল আর স্প্রিট রেখে হালাল করে নিচ্ছে। ছবি তোলার নাম ফটোগ্রাফি রেখে জায়েয করে নিচ্ছে। পুরাতন ঢোল-তবলা ছেড়ে তার স্থানে গ্রামোফোন আর মিউজিক নিয়ে আসছে আর এই নামের বদৌলতে হুরমত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে! সুদের নাম মুনাফা দিয়ে আর ঘুষের নাম সেবার অধিকার রেখে প্রকাশ্যে তার লেনদেন করছে!

وَإِلَى اللَّهِ الْمُشْتَكِي وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيم.

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হলো ‘ফটো ও ফটোগ্রাফি’। এটিই সে কূটকৌশলের ধারাবাহিকতায় আরেকটি সংযোজন। ইসলামি শরীয়ত যেখানে ছবি তোলাকে হারাম করেছে এবং তার ব্যবহারকে নাজায়েয ঘোষণা দিয়েছে, সেখানে বর্তমান যুগের একদল আলোকিত মননের দাবিদার মুসলমান এর ওপর নতুন রং চড়িয়ে প্রাচীন যুগের ছবি ছেড়ে একটি নতুন পদ্ধতি বানিয়ে নিয়েছে, এর নতুন নাম দিয়ে ব্যবহার শুরু করেছে। এখন তারা নিজেদেরকে হুরমত ও নিষিদ্ধতার ফাতাওয়া থেকে শঙ্কাহীন মনে করে বসে গেছে। যারা শুধু আধুনিক শিক্ষার মাঝে থেকে চোখ খুলেছে এবং নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠেছে, তাদের এ নিয়ে। কোনো মাথা ব্যথা নেই। প্রখ্যাত কবি আকবর মরহুমের ভাষায়,

انہوں نے دین کو کب سیکھا ہے ، رہ کر شیخ کے گھر میں

پلے کالج کے چکر میں مرے صاحب کے دفتر میں

গুরুর শরনাপন্ন হয়ে

তারা কবে দ্বীন শিখেছে,

বড় হয়েছে কলেজ ঘুরে,

সাহেব-ঘরে খেটে মরেছে।

আফসোস আর অভিযোগ হলো ঐ ব্যক্তিদের নিয়ে, যারা কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে শুধু জাহেলই নয় বরং কখনো কখনো নিজেদেরকে সবজান্তা মনে করে আইম্মায়ে ইজতিহাদ আর সালফে সালেহীনের ওপর আঙ্গুল তোলার দুঃসাহসী হতেও দেখা যায়। ছবি তোলার নাম ফটোগ্রাফি দিয়ে তাদেরকে তা জায়েয হওয়ার ফাতাওয়া ছুড়তেও দেখা যায়।

ছবি আর ফটোর মাঝে পার্থক্যকারীদের প্রমাণের উত্তর

ছবি’ আর ‘ফটো’-এর মাঝে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে তাদের প্রমাণসমূহের শক্তিমত্তা দেখুন,

প্রথম দলীল: ফটো পূজনীয় নয়

তারা ফটো জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব দলীলের আশ্রয় নেয়, তন্মধ্য – হতে সবচে’ বড় দলীল হলো, “ফটো ইবাদতের কাজে ব্যবহৃত হয় না”।

তাদের এই যুক্তির ওপর আমার প্রথম আপত্তি হলো, এখনো ভারতে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠীকে পাওয়া যায়, যারা তাদের গুরুদের ফটো পূজা করে। এছাড়া শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে ছবির সূচনা হওয়াটা আবশ্যক করে না যে, এখনো তার পূজা হতে হবে। বরং সেই ছবি প্রারম্ভিক শিরকের অন্যতম একটি শিরক। যদিও এটি বর্তমানে পূজনীয় পর, কিন্তু আগামীতে তার পূজনীয় হয়ে যাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাতো হযরত ঈসা, হযরত মারইয়াম আলাইহিমাস সলাতু ওয়াস সালামসহ অন্যান্য নবীর ছবিগুলো প্রথমদিকে শুধুমাত্র তাদের স্মৃতি সতেজ রাখা ও নিজের কাছে স্রেফ একটি স্মারক রেখে দেয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। এটি কোনো প্রারম্ভিক শিরক ছিলো না। কেননা তখন তাকে পূজা করার কোনো খেয়াল তাদের ছিলো না। কিন্তু কিছু কাল পর সেই ছবিই তাদের মূর্তিপূজার মাধ্যম হয়ে গেলো। যদি মেনে নেয়া হয় যে, কাটা ইবাদতের কাজে আসে না এবং আগামীতে আসার সম্ভাবনা নেই, তাহলে এর থেকে বড়জোর এতোটুক বুঝে আসবে যে, প্রারম্ভিক শিরকের মাঝে ফটো অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ প্রারম্ভিক শিরকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়াটাই ফটো হারাম হওয়ার একমাত্র কারণ নয়। এটি অন্যতম একটি কারণ মাত্র। আরো অনেক কারণ তো রয়েছে। আর যখন কোনো জিনিসের হারাম হওয়াটা অনেকগুলো কারণের ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন তার মধ্য হতে কোনো এক কারণের চলে যাওয়াটা তাকে হালাল করতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ, একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে অনেকগুলো অপরাধ রয়েছে। চুরি, ডাকাতি, হত্যা, আদালত অবমাননা ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন যদি তার পক্ষে সাক্ষী দাড়িয়ে তাকে হত্যার অপরাধ থেকে বেকসূর প্রমাণিত করে দেয়, তাহলে শুধু এতটুকুই তাকে মুক্ত করতে পারবে না। বরং তার ওপর অন্য অপরাধগুলোর শাস্তি বহাল থাকবে। ছবি ব্যবহারের বিষয়টিও অনেকটা অনুরূপ। আমি আমার পুস্তিকায় যেমনটি দেখিয়েছি যে, এতে অনেকগুলো অপরাধ জড়িত রয়েছে। প্রারম্ভিক শিরক, কাফেরদের সাথে আবশ্যিক সদৃশ্য, রহমতের ফেরেশতা আসতে বারণ করা ইত্যাদি।

এখন যদি ধরে নেয়া হয় যে, ছবি হারাম হওয়ার অন্যতম কারণ প্রারম্ভিক শিরকের হওয়ার বিষয়টি ফটোর ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না, তাহলে এর দ্বারা কিভাবে প্রমাণিত হয় যে, এই ফটো হারাম হওয়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে গেছে? ছবি ব্যবহারের অন্য সব কারণ নিঃসন্দেহে ফটোর মধ্যে পাওয়া যায়। যেমন, কাফেরদের সাথে সদৃশ্য, রহমতের ফেরেশতাদের বিদ্ধেষ; এগুলো কি তার নিষিদ্ধ হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়? হ্যাঁ, উক্ত আলোচনার সূত্র ধরে বড়জোর এতোটুকু বলা যেতে পারে যে, তার শাস্তির পরিমাণ কিছুটা কম হবে। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন ছবি ব্যবহারকারীকে যেই শাস্তি দেয়া হবে, তার তুলনায় সে শাস্তি কম পাবে?

এখন অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ছবি তোলার যেই বিধান, ফটোগ্রাফিরও সেই বিধান। অর্থাৎ প্রাণীর ফটো নেয়া পুরোপুরি হারাম। আর প্রাণহীন জিনিসগুলোর মধ্য হতে যেগুলোর পূজো হয়, সেগুলোর ফটো তোলাও হারাম। অন্যান্য ক্ষেত্রে ছবি ব্যবহারের যেই বিধান, ফটোরও অনুরূপ বিধান। আমরা সামনে আরো বিশদ আলোচনা করবো।
দ্বিতীয় দলীল: ফটো আয়নার মতো

তারা তাদের দ্বিতীয় দলীল হিসেবে এই যুক্তি পেশ করে যে,

“ফটোগ্রাফি মূলত প্রতিচ্ছবি। যেভাবে আয়না, পানি সহ অন্যান্য স্বচ্ছ জিনিসগুলোর ওপর সূরতের প্রতিবিম্ব পড়ে, ফটোও অনেকটা তাই। পার্থক্য হলো এতোটুকু যে, আয়নার প্রতিচ্ছবি স্থায়ী হয় না। আর ফটোর প্রতিচ্ছবি রসায়নের সাহায্যে স্থায়ী হয়। নয়তো একজন ফটোগ্রাফার তো অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি বা গঠন করে না”।

এই দলীলের সারকথা হলো, তারা ফটোকে আয়না, পানি ইত্যকার প্রতিচ্ছবির সাথে তুলনা করছেন। অর্থাৎ যেভাবে আয়নার প্রতিচ্ছবির মাঝে হারাম হওয়ার কোনো কারণ নেই, তদ্রুপ ফটোর ছবিও একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। তাহলে কেনো তাকে হারাম বলবেন? খানিকটা গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে স্পষ্টতই বুঝে আসবে যে, তাদের এই তুলনা কিয়াস শাস্ত্রের মূলনীতিসমূহের সুস্পষ্ট পরিপন্থী। একজন আলেমের দক্ষতা আরো বেশি হওয়া দরকার যে, কেনো তার চোখে এরকম বৈসদৃশ্য দুটি বস্তুর মধ্যকার পার্থক্য ধরা পড়ে না? সে কিভাবে তাদের একটির ওপর অপরটির বিধান প্রয়োগ করতে চাচ্ছে?

ফটোর ছবি আর আয়নার প্রতিচ্ছবির মধ্যে পার্থক্য

১. সবচে’ বড় পার্থক্য হলো, –যাকে তারা স্বীকারও করেছেন- আয়না ইত্যাদির প্রতিচ্ছবি স্থায়ী হয় না, পক্ষান্তরে ফটোর প্রতিচ্ছবি রসায়নিকের সাহায্যে স্থায়ী হয়। তারা এই পার্থক্যকে তুচ্ছ মনে করে উপক্ষো করতে চায়। অথচ এই পার্থক্যটাই ছবি আর প্রতিচ্ছবির মৌলিক পার্থক্য। একটি প্রতিচ্ছবিকে যতক্ষণ পর্যন্ত রসায়নিকের সাহায্যে স্থায়ী করে নেয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি প্রতিচ্ছবিই থেকে যায়। যখন তাকে রসায়নিকের সাহায্যে স্থায়ী করে নেয়া হয়, তখন সেটি প্রতিচ্ছবি বা প্রতিবিম্ব থেকে বেরিয়ে ফটো হয়ে যায়। কেননা প্রতিচ্ছবি বা ছায়া ব্যক্তির একটি অস্থায়ী প্রতিবিম্ব মাত্র। যা তার থেকে আলাদা হতে পারে না। একারণেই কোনো আয়না বা পানিকে যতক্ষণ প্রতিচ্ছবিধারী ব্যক্তির মুখোমুখি করে রাখা হয়, ততক্ষণ সেই প্রতিচ্ছবি বা প্রতিবিম্ব বাকি থাকে। যখনই তাকে তার সম্মুখ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তখন সে তার সাথে সরে যায়। মানুষ যখন রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন মাটিতে তার ছায়া পড়ে। কিন্তু এই ছায়া সবসময় ব্যক্তির অনুগামী হয়ে থাকে। সে যেদিকে চলে, তার ছায়াও সেদিকে চলে। মাটির কোনো বিশেষ অংশে এই ছবি বা প্রতিবিম্ব ততক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী ও অনঢ় হয় না, যতক্ষণ না তাকে কোনো বিশেষ ব্যবস্থাপনা বা রসায়নের সাহায্যে কিংবা অঙ্কণ করে অথবা রং-তুলি দিয়ে সেই ছবি এঁকে না নেয়া হয়।

মোটকথা হলো, একটি প্রতিচ্ছবিকে যখন কোনো পদ্ধতিতে স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত করে নেয়া হয়, তখনই সেটি ছবি হয়ে যায়। একটি প্রতিচ্ছবি বা প্রতিবিম্ব যতক্ষণ পর্যন্ত অস্থায়ী প্রতিচ্ছবি থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত শরীয়তের দৃষ্টিতে সেটি হারামও হয় না, মাকরূহও হয় না। চাই সেটি আয়না, পানি বা অন্য কোনো স্বচ্ছ জিনিসে প্রতিবিম্বিত হোক, বা ফটোর কাঁচের ওপর পড়ুক। যখন সেটি তার সীমা ছাড়িয়ে ছবির সীমায় চলে আসবে, চাই তা রসায়নের সাহায্যে হোক, বা আঁকাআঁকি ও রেখা টানার মাধ্যমে হোক এবং চাই এই ফটো ক্যামেরার কাঁচের ওপর থাকুক অথবা আয়না ইত্যকার স্বচ্ছ জিনিসের ওপর থাকুক। (স্থায়ী হয়ে যাওয়ার কারণে ফটো হয়ে যাবে)। এমতাবস্থায় তার ওপর ফটোর বিধান প্রজোয্য হবে। মোটকথা, রসায়নের সাহায্যে স্থায়ী করার পূর্বে ক্যামেরার কাঁচের ওপর ভেসে থাকা প্রতিচ্ছবিও কিন্তু হালাল ও জায়েয। যেভাবে আয়না, পানি ইত্যাদির কোনো প্রতিচ্ছবিকে যদি কোনো প্রযুক্তি বা রসায়নের সাহায্যে স্থায়ী করে নেয়া হয়, তখন সেটিও হারাম ও নাজায়েয হয়ে যায়। তখন সেটিও ক্যামেরার ছবির বিধানের আওতায় চলে আসে।

আজ যদি কেউ এমন কোনো প্রযুক্তি বা রসায়ন আবিস্কার করে যে, যখন সেটিকে আয়নায় লাগিয়ে দেয়া হবে তখন আয়নার সামনে যেই দাঁড়াবে, তার ছবি স্থায়ী হয়ে যাবে অথবা কোনো ব্যক্তি যদি সেই ছবিকে কোনো বিশেষ কলম বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে আয়নার ওপর এঁকে নেয় তখন নির্ঘাত সেই আয়নার ছবিটিও এখন নিষিদ্ধ ফটোর বিধানের আওতায় চলে আসবে।

এখানে তাদের আরেকটি সংশয় খণ্ডন করা আবশ্যক মনে করছি। তা হলো, তারা বলেছেন, “একজন ফটোগ্রাফার তো অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি বা গঠন করে না”। এখানে আমাদের জানতে হবে, تخليق اعضاء وتكوين অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি বা গঠন করা]-এর কী অর্থ?

এর দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি হলো, কোনো ব্যক্তি কোনো জিনিসের একেকটি অঙ্গ নিজ হাতে বানাবে।

দ্বিতীয়টি হলো, কোনো যন্ত্রের সাহায্যে বানাবে।

যদি আপনি শুধু প্রথম অর্থই ধরেন, তাহলে যে ব্যক্তি কোনো মেশিনের সাহায্যে লোহা, তামা বা অন্য কোনো ধাতু দিয়ে মূর্তি বা প্রতিমা বানায়, অথবা কোনো কাঠামো বা ধাঁচে ফেলে যে ব্যক্তি মূর্তি বা প্রতিমা বানায়, তার এই কাজটি হারাম হবে না? আশ্চর্য কথা। তাহলে তো বলতে হবে, যে ব্যক্তি কলমের সাহায্যে ছবি আঁকে সেও তো সরাসরি নিজের হাত দিয়ে বানাচ্ছে না। তার এ কাজটিকেও কি হারাম বলা যাবে না?

আপনার এই নীতি মেনে নেয়া হলে শুধু ফটোগ্রাফিই জায়েয হবে না, বরং মূর্তি, প্রতিমা ইত্যকার সমস্ত ছবি বানানোও হালাল হয়ে যাবে। যার অনিষ্টতা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আর যদি কোনো মাধ্যমের সাহায্যে ছবি বানানোও অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টির বিধানের আওতায় চলে আসে, তাহলে যেভাবে মেশিন বা যন্ত্রের মাধ্যমে মূর্তি বা প্রতিমা তৈরি করা এবং কলমের সাহায্যে অঙ্কণ করাটা تخلیق اعضاء وتكرين ]অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি ও গঠন করা]-এর বিধানের মাঝে শামিল, তদ্রুপ রসায়ন ও প্রযুক্তির সাহায্যে ক্যামেরার প্রতিচ্ছবিকে স্থায়ী করাটাও تخليق اعضاء وتكوين ]অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি ও গঠন করা]-এর মধ্যে শামিল।

আর যখন মেশিন, যন্ত্র বা কাঠামোর সাহায্যে মূর্তি তৈরি করা, কলম দিয়ে ছবি আঁকা: এ সব হারাম, তখন ফটোর ছবিকে রসায়নের সাহায্যে স্থায়ী করা কেনো হারাম হবে না? যদি এ কথা মেনে নেয়া হয় যে, একজন

ফটোগ্রাফার تخلیق اعضاء وتكوين বা অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি বা গঠন করে না, তাহলে বড়জোর এতোটুকু প্রমাণিত হবে যে, ফটোগ্রাফির মাঝে تشبه بالخالق বা স্রষ্টার সাথে সদৃশ্য আবশ্যক হয় না। অথচ ফটো বা ছবি হারাম

হওয়ার এটাই একমাত্র কারণ নয়। আমরা পূর্বেই জানিয়েছি যে, আরো দু’টি বড় কারণও রয়েছে। একটি হলো, এটি প্রারম্ভিক শিরকের মাঝে অন্তর্ভুক্ত।

আর দ্বিতীয়টি হলো, কাফেরদের সাথে সদৃশ্য। ফটোগ্রাফির মাঝে নিঃসন্দেহে এ দু’টি বিদ্যমান। আর আমরা পূর্বে এ কথাও বলেছি যে, কোনো ছবির মাঝে যতোক্ষণ পর্যন্ত হারাম হওয়ার কারণসমূহ থেকে নিদেনপক্ষে একটি কারণও বিদ্যমান থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ছবি জায়েয হবে না। এ কারণে ফটোর মাঝে تخليق اعضاء وتكوين অঙ্গ-প্রতঙ্গ সৃষ্টি বা গঠন] না হলেও তা নাজায়েয থাকাই সঙ্গত। আমরা আমাদের মূল আলোচনা অর্থাৎ ছবি আর আয়নার প্রতিবিম্ব; এ দু’টির পার্থক্য নিয়ে আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি। একটি কারণ তো পেশ করলাম, যা তারা মেনে নিবেন।

২. আয়না ইত্যাদির প্রতিচ্ছবি আর ফটোর মাঝে দ্বিতীয় পার্থক্য হলো, আয়নার প্রতিচ্ছবির মাঝে কাফেরদের সাথে সদৃশ্যের অপরাধ পাওয়া যায় না, পক্ষান্তরে ফটোর মাঝে পাওয়া যায়। আরেকটু খোলাসা করে বলছি, পানি ইত্যাদির মাঝে নিজের চেহারা দেখা কাফেরদের বিশেষ প্রতীক নয়। এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ঘটেছে, বলেও বর্ণিত রয়েছে। অথচ দেয়ালে ফটো ঝুলানো রোমান ক্যাথলিকসহ অন্যান্য মূর্তিপূজারী কাফের গোষ্ঠীর কার্যপদ্ধতির সাথে সদৃশ্যপূর্ণ।

৩. আরেকটি পার্থক্য হলো, পরিভাষায় আয়না ইত্যাদির প্রতিচ্ছবিকে কেউ ছবি বলে না। পক্ষান্তরে একজন অতি সাধারণ মানুষও ফটোকে ছবিই বলবে। আমি সামনে সেই প্রমাণও দিচ্ছি। এ কারণে ফটোর ওপর ছবির বিধান প্রজোয্য হওয়াই অধিক সঙ্গত, আয়নার বিধান নয়।

এখানে তিনটি বড় বড় পার্থক্যের কথা বললাম, যা ফটোকে আয়না ইত্যকার প্রতিবিম্ব থেকে আলাদা করে দেয়। কাজেই ফটোগ্রাফির ছবিকে আয়নার প্রতিচ্ছবির ওপর তুলনা করা অবান্তর কিয়াস। যা শুধু শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বিবেকের বিচারেও পরিত্যাজ্য।

তৃতীয় দলীল: আরববিশ্বের ফতোয়া <

তারা তাদের স্বপক্ষে এই দলীল পেশ করে যে,

“বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সমস্ত আলোকিত মননের অধিকারী উলামায়ে কেরামের অভিমত হিসেবে এটাই পাওয়া যায় যে, ফটোগ্রাফি ছবি আঁকা )مصوری( নয় এবং ফটোকে তারা ছবি )تصویر( বলেন না। এ কারণেই মিশর, মরক্কো, ইরান, কনস্টেন্টিনোপলের সমস্ত শীর্ষস্থানীয় পাগড়িধারী বুযুর্গদেরকে আমরা কাগজের আলখেল্লায় ভারতবর্ষে ঘুরাফেরা করতে দেখি।”

তাজ্জব না হয়ে পারছি না। একজন আলোকিত মননের অধিকারী আলেম; যিনি নিজেকে আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও সালফে সালেহীনের তাকলীদের মুখাপেক্ষী মনে করেন না! তিনি কিভাবে (নিজের মনোবৃত্তির সমর্থন পাওয়া মাত্রই) এখন নিজের সমকালীন ব্যক্তিত্বদের সামনে নতশীর হয়ে পড়ছেন!

আর সেই স্বাধীন কলম; যা ইসলামের মহান পূর্বসূরীদের অনুসরণকে একটি অন্ধকার অধ্যায় মনে করে! যা সংখ্যাগরিষ্ঠ ফুকাহায়ে কেরাম, মুহাদ্দিসীনে কেরাম (যাঁদের মধ্যে অনেক সাহাবীও রয়েছেন)-এর কথাকে নির্দ্বিধায় ভুল অভিহিত করতে কেঁপে ওঠে না! সেই কলম কী করে নিজের অল্প ক’জন সমবয়সী লোকের ফাতাওয়া হাতে নিয়ে মুসলমানদের জন্যে একটি হারামকে হালাল করতে চাচ্ছে?…. অথচ এটা কি আফসোসের বিষয় নয় যে, যখন নিজের অভিমতের বিরুদ্ধে চলে যায়, তখন হযরত আলী রাযি ও হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. এর কথাও শুনতে মন চায় না। আর পক্ষে আসলে গুটিকয়েক সমবয়সী লোকের কথাও দলীল হয়ে যায়? বিশেষকরে এমতাবস্থায় যখন, তার বিরুদ্ধে হাজারো আলেমের ফাতাওয়া বর্তমান। কাজেই মরহুম কবি আকবরের কবিতার সূরে বলতে হয়, دل کو بھا جائے تو اکبر کی خرافات اچھی ‘মনের সাথে মিলে গেলে মোঘল সম্রাট আকবরের মনগড়া রুসুমও ভালো’।

আমি জানি না, আলোকিত মনন আর অন্ধকারাচ্ছন্ন মনন নিরুপণ করার জন্যে তাদের কাছে কী মাপকাঠি আছে? যার কারণে তারা ভারতের ভেতরের ও বাইরের হাজারো উলামায়ে কেরামকে আলোকিত মননের রাজ্যে প্রবেশ করার অনুমতি দিচ্ছেন না। যাদের অপরাধ শুধু একটাই। আর তা হলো, শরীয়তের বিধানাবলীর ক্ষেত্রে দুঃসাহস আর ঔদ্ধত্য দেখিয়ে দ্বীনকে নিজেদের মনোবৃত্তির অনুগামী বানান না; এবং তারা ইসলামের সুমহান পূর্বসূরীদেরকে নিজেদের চে’ কুরআন ও হাদীসের অধিক জ্ঞানী মনে করে তাদের যে কোনো সিদ্ধান্তকে নিজেদের অভিমতের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

যদি বাস্তবেই এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তারা আলোকিত মনন হওয়া থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে এই বঞ্চনা তাদের জন্যে মহাগৌরব। তাদের আর আলোকিত মনন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের অন্ধকার মননের সামনে ওদের হাজারো আলোকিত মনন মাটি-ধুলোয় লুটোপুটি খাবে।

خدا گواه که جرم ما ہمیں عشق است

گناه گبر و مسلمان بحرم ما بجد

তার এই কথার ওপরও আমার আপত্তি রয়েছে যে, যেই সব উলামাকে তার পরিভাষায় ‘আলোকিত মনন’ বলা যায়, তাদের প্রত্যেকে এই মাসআলায় তার সমর্থক হয়ে ফটো আর ফটোগ্রাফিকে হালাল মনে করেন। বরং এখন তো সেই পারিভাষিক আলোকিত মননের অধিকারী ব্যক্তিত্বরা -যারা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত ফটোকে শুধু জায়েযই মনে করতেন না, বরং কার্যত মুসলমানদেরকে তার শিক্ষাও দিতেন- যখন তাদের নিজেদের শেষ পরিণতির কথা পড়েছে, তখন তারা নিজেদের ভুল ধারণা থেকে তাওবা করে (যেমনটি একজন মুসলমানের করণীয়) পরিষ্কার ভাষায় সত্য স্বীকার করেছেন। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জনাব আবুল কালাম আযাদকে স্বাগত জানাই। আল্লাহর কাছে দু’আ করি, এই সাইয়্যেদ সাহেব (অর্থাৎ সাইয়্যেদ সুলায়মান নদভী সাহেব [তিনিও তার মৃত্যুর পূর্বে ফটোর মাসআলায় নিজের ভুল বুঝতে পেরে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছিলেন)) ও তার অন্যান্য সমচিন্তার লোকদেরকে জনাব আযাদ সাহেবের পথ ধরার তাওফীক দিন। আমা দেখেছি যে, জনাব আযাদ সাহেব একটি দীর্ঘ সময় তার পত্রিকা ‘আল হেলাল’ ছবি সহ ছাপতেন। কিন্তু পরে নিজ ভুল বুঝতে পেরে সেই অবস্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। সেমতে যখন শেষ জীবনে তার কয়েকজন ভক্ত তাঁর ওপর একটি স্মারকগ্রন্থ লেখে তখন তারা সেখানে তার ছবি সংযুক্ত করতে চেয়েছিলো। তিনি পরিষ্কার ভাষায় তাদের নিষেধ করে দেন। তাদের চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছেন,

“ছবি তোলা, রাখা ও প্রকাশ করা; সবই নাজায়েয। এটি আমার সাংঘাতিক ভুল ছিলো যে, আমি ছবি তুলেছি ও ‘আল হেলাল’-কে ছবি সহ ছেপেছি। আমি আমার সেই ভুল থেকে তাওবা করেছি। আমার পেছনের সেই ভুলগুলো লুকানো উচিৎ, তাকে নতুন করে প্রচার করা কিছুতেই সমীচিন হবে না।”

[আবুল কালাম আযাদ]

লক্ষ্য করুন, এখানে তার কাছে ফটো তোলার অনুমতি চাওয়া হয়েছিলো। যার উত্তরে তিনিও ফটোকেও তাসবীর ]تصویر[ এর আওতায় এনে লিখেছেন,

“ছবি তোলা, রাখা ও প্রকাশ করা; সবই নাজায়েয”।

এর দ্বারা মাওলানা সুলাইমান নদভী সাহেবের পেশ করা আলোকিত মননের দাবীদারদের প্রমাণের গোমরও ফাস হয়ে গেছে। তারা বলেছিলেন,

“ফটোগ্রাফিটি কোনোভাবেই ছবি আঁকা )مصوری নয় এবং ফটোকেও ছবি )تصویر( বলা যায় না”।

জনাব মাওলানা আবুল কালাম আযাদ সাহেব তো আপনার পরিভাষায় অন্ধাকারাচ্ছন্ন মননের অধিকারী নন। আপনি তো তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, যাদের একটি ছবিই ছবি হালাল হওয়ার শ্রেষ্ঠ ফতোয়া।

আল্লাহ তা’আলা আযাদ সাহেবকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং অন্যান্য মুসলমানদেরকেও তার তাওফীক দান করুন। আমীন।

ولا حول ولا قوة إلا بالله.

আহকার মুহাম্মাদ শফী’

সুত্রঃ আলাতে জাদীদাহ: ৮৯-৯৬

Loading