بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى اما بعد
অধুনা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা এবং জয়যাত্রা স্বীকৃত। তবে এক চিরন্তন সত্য হলো বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। আর মুসলিম জাতির জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মোতাবেক সকল ইবাদত সমগ্র বিশ্বের সর্বযুগের জন্য এক অলঙ্ঘনীয় ও অপরিবর্তনশীল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সার্বিকভাবে পরিপূর্ণ বিষয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য। ইবাদতে নিয়ন্ত্রণ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমীকরণের জন্য মোটেও নয়। ইবাদত আদায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যতটুকু সহায়ক ততটুকুই গ্রহণযোগ্য। সহায়ক না হলে একচুল পরিমাণও কোন যুগের জন্যই গ্রহণযোগ্য না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অচল-নিথর হয়ে গেলেও ইবাদত নিজ নিজ জায়গায় বহাল থাকবে। অধুনা বিজ্ঞানের সূচনার পূর্বে ইবাদত যেমন ছিল এবং পৃথিবীর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তেমনি থাকবে। পৃথিবীর কোন প্রান্তে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সূর্যের কোন খোঁজ খবর না থাকলেও বা কোন ব্যক্তি কোন কারণে না জানলেও, কেবলার সঠিক সন্ধান না পেলেও ইবাদত পালনের আদেশ আপন নিয়মে বহাল থাকে।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যেখানে সময় নির্ধারণও আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে পরিচালিত। নামাজের সময় নির্ধারণ হয় সূর্যের অবস্থানের মাধ্যমে, কিন্তু রমযান, ঈদ ও হজ্জের মতো ইবাদতের মাস নির্ধারণ হয় চাঁদ দেখে। আধুনিক যুগে একটি প্রশ্ন বারবার ওঠে: “যখন সূর্যের হিসাব (solar calculation) গ্রহণ করা হচ্ছে, তখন চাঁদের হিসাব (lunar calculation) কেন নয়?” শরীয়ত বলেঃ ইবাদতের ক্ষেত্রে চাঁদ দেখা (রু’ইয়াত)-ই একমাত্র শরয়ী পদ্ধতি, শুধুমাত্র হিসাব বা পূর্বনির্ধারিত ক্যালেন্ডারের উপর নির্ভর করা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটা দেশের মধ্যে সূর্যের হিসাবের তারতম্যের কারণে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সময়ের শুরু, শেষ এবং ইফতার ও সাহরির সময়ের মধ্যে ৫-৭ মিনিটের তারতম্য পরিলক্ষিত হতে থাকে। সারা বিশ্বেই এই তারতম্য হতে থাকে। এখানে সোলার ক্যালেন্ডারের কোন ভূমিকা নেই। মুসলমানদের নামায, ইফতার, সাহরি ও ঈদ সারা বিশ্বের ক্যালেন্ডারের সাথে কোথাও কখনো যুক্ত ছিল না এবং এখনো নেই। বরং নিজ নিজ ভৌগোলিক সিমানার সূর্যের এবং চন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত।
যেমনঃ সোলার ক্যালেন্ডার হিসাবে সারা বিশ্বে ১লা মে ২০২৬ ইং ছিল শুক্রবার। শুক্রবারে ঢাকায় সূর্যাস্ত হয়েছে ৬:২৮ মিনিটে। সরকারিভাবে বাংলাদেশ ভারতের আধা ঘন্টার ব্যবধান হলেও ঢাকা থেকে ভারতের কাশ্মীর এর শেষ প্রান্তে সূর্যাস্তের ব্যবধান প্রায় এক ঘন্টা। আর সৌদি আরবের ব্যবধান প্রায় তিন ঘন্টা। আরো পশ্চিমের ব্যবধান আরো বেশি। কোথাও দিন, কোথাও রাত। অথচ সোলার ক্যালেন্ডার হিসেবে তারিখ একই। সুতরাং সোলার ক্যালেন্ডার হিসেবে সারা বিশ্বের ২৪ ঘন্টার সময়ের হিসাব এক দেখানোর চেষ্টা হলেও ভৌগোলিক সিমানা হিসেবে সময়ের তারতম্য আগের মতই বহাল রয়েছে। তাতে কোনই সংযোজন বিয়োজন সম্ভব হয়নি এবং কারো পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। সুতরাং সোলার সিস্টেমের ক্যালেন্ডার সারা বিশ্বের বৈশ্বিক প্রয়োজনে এক হলেও মুসলমানদের ইবাদতের ক্ষেত্রে তার বিন্দুমাত্র কোন ভূমিকা নেই। সোলার ক্যালেন্ডার সারা বিশ্বের নিছক তারিখ জানার জন্য। নামায, সাহরি ও ইফতারের সময় জানার জন্য মোটেও নয়।
এক দিনের সাহরী-ইফতারের সময়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সময় নিজ নিজ ভৌগলিক সিমানার হিসাবের ভিত্তিতে পূর্ণ হলে দ্বিতীয় দিন শুরু হয়। এভাবে নিজ নিজ ভৌগোলিক সিমানার মধ্যে যখন চন্দ্রের হিসাব ২৯ দিন পূর্ণ হয় তখন নতুন মাসের অনুসন্ধান শুরু হয়। চন্দ্রের এই হিসাব সৌদি আরবের ভিত্তিতেও পৃথিবীর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মেলানো সম্ভব নয়। কারণ, উদাহরণ স্বরূপঃ সন্ধ্যা ছয়টায় সৌদি আরবে যখন পহেলা তারিখের চাঁদ দেখা যাবে তখন বাংলাদেশে রাত ৯ টা। এ সময় সৌদির নতুন চাঁদ বাংলাদেশে দৃশ্যমান হওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব না। সৌদির এই চাঁদের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে পরের দিন সকালে ঈদ করতে চাইলে তা হবে সৌদি আরব ব্যাপী কোথাও ঈদ শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশে ঈদের নামায পালন করা। কেননা বাংলাদেশে যখন সূর্যোদয় হবে তার তিন ঘন্টা পরে সৌদিতে সূর্যোদয় হবে। বাংলাদেশে যখন ঈদের নামায পড়া হবে তখন সৌদিতে ঘোর অন্ধকার। ফলে সৌদির সাথে মিল করে ঈদ করতে গিয়ে সৌদির আগেই ঈদ করা হবে যা বড়ই হাস্যকর বিষয়। এমন বিষয়ের ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে যে, মদীনা শরীফের মুহাব্বতে মদীনা শরীফ পার করে চলে গেছে।
এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয় হলো যে, সৌদি আরবের পহেলা তারিখের এ নতুন চাঁদ বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমায় পৌঁছতে সময় লাগবে আরো কমপক্ষে ২১ ঘণ্টা। অর্থাৎ সৌদিতে উদিত হওয়া ঐ পহেলা তারিখের নতুন চাঁদই বাংলাদেশের আকাশে সন্ধ্যায় দৃশ্যমান হবে কমপক্ষে আরো ২১ ঘণ্টা পর। তাহলে দেখা যাবে যে, সৌদির সাথে মিল করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভৌগলিক পরিসীমায় যখন চাঁদ উদিত হবে তার আগেই সারাদেশে ঈদ উদযাপন হয়ে গেছে। এই মহাবিপর্যয়ের মূল কারণ হলো রসুলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সরাসরি হুকুম صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ তোমরা রোযা রাখ চাঁদ দেখার ভিত্তিতে এবং তোমরা রোযা ভঙ্গ কর চাঁদ দেখার ভিত্তিতে, এই হুকুম উপেক্ষা করা। পক্ষান্তরে সৌদি আরবের সাথে চাঁদের মিল করানোর কোন সহীহ হাদিস তো দূরের কথা, হাদীস ভাণ্ডারে কোন ধরনের কোন যঈফ হাদীসও নেই। এটা হল ইসলামকে উপেক্ষা করে প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ার এক মহাবিপর্যয়। মূলতঃ লুনার ক্যালেন্ডারকে ইস্যু বানিয়ে ইসলামী বিশ্বকে দোদুল্যমান করে তোলা এবং ইসলামী অনুভূতিতে কুঠারাঘাত করার এটা একটা বড় হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। হাদিস শরীফে সরাসরি “দেখা” (رؤية) শর্ত করা হয়েছে “হিসাব” বা “ক্যালেন্ডার” এর কোনো উল্লেখ নেই। فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا العِدَّةَ ثَلَاثِينَ যদি তোমাদের কাছে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়, তবে ৩০ দিন পূর্ণ করো।” রসুলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আকাশে মেঘ থাকলে ৩০ দিন পূর্ণ করো। এখানে “হিসাব করে নাও” বলা হয়নি, এটি প্রমাণ করে: ইসলাম নিশ্চিততার পথ বেছে নিয়েছে, অনুমান নয়।
যেহেতু সৌদি আরবে উদিত হওয়া চাঁদই কমপক্ষে ২১ ঘণ্টা পরে বাংলাদেশের আকাশে দৃশ্যমান হবে, এই হিসেবে সৌদি আরবের পহেলা তারিখের চাঁদই নিঃসন্দেহে বাংলাদেশেরও পহেলা তারিখের চাঁদ। এটাকেই জনশ্রুতিতে বলা হয় সৌদি আরবের চাঁদ বাংলাদেশের একদিন পূর্বের। একদিন পূর্বের হিসাব শুধুই ভৌগোলিক সিমানা বা সৌর হিসাবে। কেননা সৌর হিসাবে দিন শুরু হয় মধ্যরাত বারোটার পর থেকে। বাস্তবে তা ঐ পহেলা তারিখের চাঁদই। বাংলাদেশের সন্ধ্যায় যখন পহেলা তারিখ, সৌদি আরবে তখনো ঐ পহেলা তারিখের চাঁদের হিসাবই চলছে। কেননা সেখানে সূর্যাস্তের এখনো তিন ঘন্টা বাকি। দ্বিতীয় তারিখের চাঁদ সৌদিতে এ সময় দেখা সম্ভবই না। দ্বিতীয় তারিখের চাঁদ যখন সৌদিতে দেখা যাবে বাংলাদেশে তখন আগের মতই কমপক্ষে রাত নয়টা। সৌদি আরবের দ্বিতীয় তারিখের চাঁদ বাংলাদেশে আগের মতই কমপক্ষে ২১ ঘণ্টা পর দেখা যাবে। এ কারণে বাংলাদেশে চাঁদের পহেলা তারিখে সৌদিতে দ্বিতীয় তারিখ বলাটা একটা ভিত্তিহীন জিনিস যা নিছক জনশ্রুতি। পহেলা তারিখের চাঁদের এই অনুসন্ধান সৌদি আরব বা আন্তর্জাতিক কোন প্রকার ক্যালেন্ডারের সাথে কোন ভাবেই সম্পৃক্ত না। বরং শুধুই ইবাদতকারীর নিজ নিজ ভৌগোলিক সিমানার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং যেখানে সোলার ক্যালেন্ডারই সম্পূর্ণ অচল সেখানে লুনার ক্যালেন্ডারকে সোলার ক্যালেন্ডারের মাপকাঠিতে বানানোর চেষ্টা যৌক্তিকভাবেও কোন কাজের মধ্যে গণ্য না। ইসলামিক কোন কাজ তো নয়ই। এটা ভবিষ্যতে কোন যুগে কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে আশা করাও নিরর্থক। ৬১৮হিজরিতে রচিত কিতাব ‘আলমুলাখ্খাসের’ ব্যাখ্যায় মূসা পাশা বিন মুহাম্মাদ (৮৯৯ হি.) লেখেনঃ وأوضح الأوضاع هوالهلال، لكن رؤية الهلال تختلف باختلاف المساكن، كما أشرنا إليه، فلم يلتفت إليها عند أهل الحساب إلا في الأمور الشرعية امتثالا لأمر الشرع চাঁদের কলাসমূহের সবচেয়ে সুস্পষ্ট কলা হল, হিলাল। কিন্তু স্থানভেদে হিলাল দেখা ভিন্ন ভিন্ন হয়। এজন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হিলালের দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। কিন্তু দ্বীনি বিষয়াদিতে শরীয়তের হুকুম তামিল করার জন্য হিলালকে গ্রহণ করেছেন। (শরহু চিগমিনী, পৃষ্ঠা: ১২৭, মাকতাবায়ে আশরাফিয়া দেওবন্দ থেকে ১৩৮৭ হি.-এ মুদ্রিত)
ইবাদতের ক্ষেত্রে কেন রু’ইয়াত অপরিহার্য? কেননা ইবাদত ওহী নির্ভর। নিজের যুক্তি দিয়ে পরিবর্তন করা যাবে না, বরং যেভাবে নির্দেশ এসেছে, সেভাবেই পালন করতে হবে। সন্দেহ পরিহার করে বাস্তবতার উপর আমল করতে হবে। চাঁদ দেখা; একটি নিশ্চিত আমল, বিজ্ঞান ভিত্তিক হিসাব; মানুষের উপর নির্ভরশীল। দেখুন: গ্রামের সাধারণ মানুষও চাঁদ দেখে আমল করতে পারে, কোনো যন্ত্র বা বিশেষজ্ঞ দরকার নেই। “শুধু হিসাব ভিত্তিক ক্যালেন্ডার” সমস্যা কোথায়? যদি বলা হয়: “আগে থেকেই ১২ মাস ঠিক করে নেওয়া হবে” তাহলে সমস্যা: বাস্তব চাঁদের সাথে মিল নাও থাকতে পারে! হাদিস শরীফের সরাসরি নির্দেশ উপেক্ষা হয়! নিশ্চিততার বদলে অনুমান নির্ভর হয়ে যায়!। তাই এটি জুমহুর আলেমদের মতে গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এই পদ্ধতি কি যৌক্তিক? বলি যে, হ্যাঁ, বরং আরো শক্তিশালী!। চাঁদ দেখা তো সরাসরি পর্যবেক্ষণ, কোনো ত্রুটি হলে তাৎক্ষণিক সংশোধন সম্ভব, বিজ্ঞানও বলে: visibility (দেখা) এরপর দেখা অনুযায়ী calculation (হিসাব) তাই ইসলাম বাস্তবতাকেই ভিত্তি করেছে।
ইসলামী শরিয়তে চন্দ্রমাস এবং রোজা রাখার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাবে চাঁদ দেখার উপর আমলের জন্য ‘হাদিসে হযরত কুরাইব’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সহিহ মুসলিম শরিফ, কিতাবুস সিয়াম, হাদিস নম্বর: ১০৮৭, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৬৫ ও তিরমিজি শরিফ, হাদিস নং ৬৯৩, আবু দাউদ শরিফ, হাদিস নং ২৩৩২, নাসাঈ শরিফ, হাদিস নং ২১১১ এ হযরত কুরাইব রহ. বর্ণনা করেন: হজরত উম্মুল ফজল বিনতে হারিস রা. তাঁকে সিরিয়ায় হজরত মুয়াবিয়া রা. এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। হযরত কুরাইব রহ. বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে তাঁর কাজ সম্পন্ন করলাম। আমি সিরিয়া থাকাকালেই রমজানের চাঁদ দেখা গেল। আমরা জুমার রাতে চাঁদ দেখেছিলাম। এরপর রমজানের শেষ দিকে আমি মদিনা শরিফে ফিরে এলাম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আমাকে সফর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর চাঁদের প্রসঙ্গ তুলে বললেন, “তোমরা কবে চাঁদ দেখেছিলে?” আমি বললাম, “আমরা জুমুআর রাতে চাঁদ দেখেছি।” হযরত ইবনে আব্বাস রা. জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি নিজে দেখেছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমি দেখেছি এবং অন্য লোকেরাও দেখেছে। তারা রোজা রেখেছে এবং হজরত মুয়াবিয়া রা.-ও রোজা রেখেছেন।” তখন হজরত ইবনে আব্বাস রা. বললেন: “কিন্তু আমরা তো শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি। তাই আমরা শনিবার থেকে মাস গননা করে রোজা রাখতেই থাকব যতক্ষণ না আমরা ৩০ দিন পূর্ণ করি অথবা নিজেরা চাঁদ দেখি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হজরত মুয়াবিয়া রা. এর চাঁদ দেখা এবং তাঁর রোজা রাখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়?” হজরত ইবনে আব্বাস রা. উত্তর দিলেন: “না, রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের এভাবেই আদেশ করেছেন।” এই হাদিস থেকে আঞ্চলিক ভাবে চাঁদ দেখার উপর আমল করা বুঝা যায়। আলবেরুনী রহ. আলআসারুল বাকিয়া আনিল কুরূনিল খালিয়া, পৃষ্ঠা : ৬৬ এ লেখেনঃ এটা সম্ভব নয় যে, রমাযান মাস সবসময় ত্রিশ দিনেই হবে এবং এটাও সম্ভব নয় যে, মাসের শুরু ও শেষ সমগ্র বিশ্বে একই তারিখে হবে। যেমনটা তাদের ক্যালেন্ডারে দেওয়া থাকে।
হযরাতে তাবেয়ী রহ. এবং আদি যুগের মুহাদ্দিসগণের রহ. কিতাব থেকে সরাসরি চাঁদ দেখা (রুইয়াত) সংক্রান্ত দলিলগুলো খুবই স্পষ্ট। মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৬৭, হাদিস নং: ৯১২৩ এ উল্লেখ আছেঃ عَنْ ابْنِ سِيرِينَ أَنَّهُ كَانَ لَا يُعْجِبُهُ قَوْلُ أَصْحَابِ الْحِسَابِ وَيَقُولُ: إنَّمَا هِيَ الرُّؤْيَةُ হযরত ইবনে সিরীন র. থেকে বর্ণিত যে, তিনি গণনাকারীদের (জ্যোতির্বিদদের) কথা পছন্দ করতেন না এবং বলতেন: “নিশ্চয়ই ইবাদতের ভিত্তি হলো নিজ চোখে চাঁদ দেখা।” হযরত ইমাম ইবনে সিরীন র. জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের বদলে সরাসরি দর্শনকে গুরুত্ব দিতেন। মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৫৫, হাদিস নং: ৭৩০১ এ উল্লেখ আছেঃ عَنْ عَطَاءٍ قَالَ: إذَا شَهِدَ عِنْدِي مَنْ أَثِقُ بِهِ أَنَّهُ رَأَى الْهِلَالَ قَبِلْتُ شَهَادَتَهُ وَصُمْتُ হযরত আতা র. বলেন, “যখন আমার কাছে এমন কোনো ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যাকে আমি বিশ্বাস করি যে সে নিজ চোখে চাঁদ দেখেছে, তবে আমি তার সাক্ষ্য গ্রহণ করি এবং রোজা রাখি। মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৬৯ এ উল্লেখ আছেঃ عَنْ إبْرَاهِيمَ، قَالَ: كَانُوا يُحِبُّونَ أَنْ يَتَرَاءَوْا الْهِلَالَ فِي رَمَضَانَ হযরত ইবরাহিম নখয়ী র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “তাঁরা (সাহাবী ও তাবেয়ীগণ র.) রমজানের চাঁদ তালাশ করতে এবং তা সশরীরে দেখতে পছন্দ করতেন। মুআত্তা মালিক, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৮৬, হাদিস নং: ৬৩৫ এ উল্লেখ আছেঃ عَنْ نَافِعٍ، عَنْ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَكَرَ رَمَضَانَ فَقَالَ: لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلَالَ، وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ হযরত নাফে র. থেকে বর্ণিত যে, রসুলুল্লাহ ﷺ রমাজানের কথা উল্লেখ করে বলেছেন: “তোমরা চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা রেখো না এবং তা না দেখা পর্যন্ত রোজা ভাঙবে না। শরহু মাআনিল আসার (তহাবী শরিফ), খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫১ এ উল্লেখ আছেঃ إنَّمَا كُلِّفْنَا الرُّؤْيَةَ، وَلَمْ نُكَلَّفْ بِحِسَابِ النُّجُومِ ইবনে শিহাব আল-জুহরি রহ. বলেনঃ আমাদের কেবল চাঁদ দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, নক্ষত্রের হিসাব করার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। উপরের দলিলগুলো থেকে স্পষ্ট যে, তাবেয়ী মুহাদ্দিসগণ রহ. চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে ‘আল-রুইয়াতুল বিল বাসার’ বা সরাসরি চাক্ষুষ দর্শনকেই শরিয়তের অকাট্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করতেন।
নামাজের ক্যালেন্ডার বা সময়সূচি তাত্ত্বিকভাবে অপরিবর্তনশীল, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে পরিবর্তনশীল। সূর্যের গতিবিধি সুশৃংখল স্থির: পৃথিবী তার কক্ষপথে যেভাবে ঘোরে, তাতে প্রতি বছর একই তারিখে সূর্য একই অবস্থানে থাকে। এই হিসেবে ক্যালেন্ডারটি প্রতি বছর একই থাকে (অপরিবর্তনশীল)। আপনি যদি এক শহর থেকে অন্য শহরে যান, তবে সময় বদলে যাবে। ঢাকা আর সিরাজগঞ্জের সময় এক হবে না। তাই এলাকাভেদে এটি পরিবর্তনশীল। তাই উম্মেতর ইজমা হলো নামাজের ক্ষেত্রে গাণিতিক ক্যালেন্ডার নির্ভরযোগ্য। কিন্ত রমাজান, ঈদ এবং হজ নির্ধারণের জন্য আল্লাহ তাআলা চাঁদের ‘রুইয়ত’ বা দেখাকে শর্ত করেছেন। তাই মাসের ক্ষেত্রে কেবল ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভর করা যায় না, চাঁদ দেখা জরুরি। কেননা চাঁদের গতিবিধিও সুশৃংখল, তবে সূর্যের মতো স্থির নয়, বরং পরিবর্তনশীল। বরং চাঁদের গতিবিধি এমন অস্থির যে, এটা নিয়ে বরং বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ হয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর হল সূর্যের একই হিসাব চলছে, কিন্তু চন্দ্রের হিসাব আগের বছর পরের বছরেই মিল নেই। ২০২৬ সালের ৯ই মে শনিবার নামাজের যে সময়সূচী ঢাকাতে আছে, ২০২৭ সালের ৯ই মে ঢাকাতে একই সময় সুজি থাকবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু একই দিনে উভয় বছরে চন্দ্রের হিসাব মেলেনা, এটা আমার কোন দাবি নয় বরং বিজ্ঞানীদের গবেষণা, যেমনঃ নিউমুনের সময়ের ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট কোন ঐক্যমত নেই। আজকে ৯ মে ২০২৬, শনিবার, সকাল ৯ টা ১৫ মিনিট ০৮ সেকেন্ডে চাঁদের আলোকিত অংশ: ৫৭.৪%, চাঁদের বয়স: ২১ দিন ১৫ ঘন্টা ২৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। আগামী বছর ৯ মে ২০২৭, রবিবার, সকাল ৯ টা ১৫ মিনিট ০৮ সেকেন্ডে চাঁদের আলোকিত অংশ: ৯.৫%, চাঁদের বয়স: ২ দিন ১৬ ঘন্টা ১৬ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড। চাঁদ পর্যবেক্ষণ পরিষদ বাংলাদেশ এর দীর্ঘদিনের গবেষণা মতে দেখেছি, রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা এক কথা বলে, আমেরিকার বিজ্ঞানীরা অন্য কথা বলে। আবার এটা নিয়ে যারা গবেষণা করে তাদের তথ্য কোন কোন মাসে পুরোপুরি মেলে না। যেমন চলমান যিলকদ মাসে বিজ্ঞানীদের তথ্য মেলে নাই। তাদের তথ্য ছিল বাংলাদেশে এ মাসে চাঁদ দেখা যাবে, বাংলাদেশের ৯০ ভাগ অঞ্চলের আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও ব্যাপকভাবে চাঁদ দেখার উদ্যোগ গ্রহণ করা সত্ত্বেও চাঁদ কারো চোখে পড়েনি। অথচ দীর্ঘক্ষণ হলো চাঁদ আকাশে ছিল। যেহেতু চন্দ্রের গতিবিধি স্থির নয়, তাই লুনার ক্যালেন্ডারও সম্ভব নয়। Jackson State University (JSU) থেকে নিউক্লিয়ায়ার ফিজিক্সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করা ছাড়াও বৃটেন, জার্মানি ও আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সসহ সাইন্সের আরো কিছু বিষয়ে উচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারী এবং বিজ্ঞানের জগতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী প্রতিষ্ঠান الجمعية اللبنانية للأبحاث العلمية -এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ড. ইউসুফ মুরওয়ার লেখা “আলউলূমুত তাবয়িয়্যাহ ফীল কুরআন পৃ. ১১-১২’’ এ যুক্ত আছে। তিনি লিখেছেন- ‘যেহেতু মুসলিম বিশ্ব মাশাআল্লাহ বেশ বড় সীমানা জুড়ে বিস্তৃত। ইন্দোনেশিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পর্যন্ত, ১৪২ ডিগ্রি পূর্ব থেকে ১৮ ডিগ্রি পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই ভৌগোলিকভাবে ইসলামী বিশ্বকে তিনটি জোনে ভাগ করা চাই।….. এবার কোনো এক জোনে নতুন চাঁদ দর্শনযোগ্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, অবশ্যই অবশ্যই অন্য দুই জোনেও তা দর্শনযোগ্য হয়েছে।
ইসলামে ইবাদতের সময় নির্ধারণ অনুমান বা হিসাবের উপর নয়, বরং নিশ্চিততার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই রাসূল ﷺ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও চাঁদ দেখে ঈদ করা, এটাই একমাত্র নিরাপদ, শরয়ী ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। এজন্যই হাদিসে হযরত কুরাইব রহ. এর মতো আজ ৯ মে ২০২৬ ইং রোজ শনিবার সৌদি আরবে পবিত্র যিলকদ মাসের ২২ তারিখ, ভারতে পবিত্র যিলকদ মাসের ২১ তারিখ আর বাংলাদেশে পবিত্র যিলকদ মাসের ২০ তারিখ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অনুমান বা হিসাব নির্ভরতা ছেরে রাসূল ﷺ এর সুন্নত মতো একমাত্র নিরাপদ, শরয়ী ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরনের তাউফিক দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন বিহুরমাতি সায়্যিদির মুরসালিন ﷺ, আমিন।
৯ মে ২০২৬ ইং শনিবার সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে রোজা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরিয়াহ বিশ্লেষণ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে চাঁদ পর্যবেক্ষণ পরিষদ বাংলাদেশের সদর ও চেয়ারম্যান মাওলানা ইসমাইল সিরাজী দা. বা. উপরক্ত বক্তব্য প্রদান করেন।
দাওয়াত সুন্নাহ বাংলাদেশের সভাপতি ও চাঁদ পর্যবেক্ষণ পরিষদ বাংলাদেশের রুকনে শূরা হযরত মাওলানা জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুসের সঞ্চালনায় ও দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেনঃ বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ এর মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, আস্সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী, তেজগাঁও পলিটেকনিক মসজিদের খতিব মাওলানা আবুল বাশার মুহা. সাইফুল ইসলাম, জমঈয়তে আহলে হাদিসের সভাপতি ড. অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফারুক, ফুরফুরা মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. নোমান, লালবাগ মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, পটিয়া মাদ্রাসার প্রধান মুফতি, শামসুদ্দিন জিয়া, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ডক্টর এস এম লুৎফুল কবির প্রমুখ। জাতীয় এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম মুফতি মাহমুদুল হাসান।
![]()