Rahmania Madrasah Sirajganj

মাহে রমাযান গুরুত্ব ও তাৎপর্য, জেনে নিন রমাযানের সকল মাসআলা-মাসাইল

نحمده و نصلي علي رسوله الكريم اما بعد

রমজান আত্মশুদ্ধির মাস, বিভিন্ন জায়গায় যেতে দুটি রাস্তা থাকে, একটা লম্বা রাস্তা, দীর্ঘ রাস্তা, আর একটা সংক্ষিপ্ত রাস্তা, যারা লম্বা বা দীর্ঘ রাস্তা দিয়ে যেতে পারেনা, দুর্বল, তারা সংক্ষিপ্ত রাস্তা অবলম্বন করে, ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলাকে পাওয়ার দুটি রাস্তা আছে, একটি লম্বা, আর একটি সংক্ষিপ্ত, রমজান ছাড়া বাকি নয় মাসে আল্লাহ তাআলাকে পাওয়া, এটা আল্লাহ তাআলাকে পাওয়ার লম্বা রাস্তা, দীর্ঘ রাস্তা, আমরা যারা আল্লাহ তাআলার দুর্বল বান্দা, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা, আল্লাহ তাআলাকে পাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা রমজান মাস নিআমত স্বরূপ দিয়েছেন, তাই আল্লাহ তাআলাকে পাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা হল, মাহে রমাজান, কিন্তু রমাজানের দুইটি বিষয় এখানে, একটি রমজানের শরীর, আরেকটি রমজানের আত্মা, শুধু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকা এবং বিভিন্ন ধরনের গীবত, পরনিন্দা, অহংকার-হিংসা ইত্যাদি গুনাহের মধ্যে লিপ্ত থাকা, এটা রমজানের শরীর হলেও, রমজানের আত্মা হল ফজরের আগ থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিষয় সমূহ থেকে বিরত থাকা, সাথে সাথে বেশকিছু গুনাহ, যেমন গীবত, অনর্থক আলোচনা, কুধারণা, কুদৃষ্টি, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, যে সকল গুনাহ তিলে তিলে মানুষকে শেষ করে দেয়, সকল প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে হেফাজত করার চেষ্টা করা, তাহলে রমাজানের শরীরের সাথে সাথে আত্মার হক আদায় হবে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন হবে৷ হিজরীবর্ষের নবম মাসটির নাম রমাযানুল মুবারক। এ মাসের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য বলার অপেক্ষা রাখে না। এ মাস আল্লাহ তাআলার অধিক থেকে অধিকতর নৈকট্য লাভের উত্তম সময়, পরকালীন পাথেয় অর্জনের উৎকৃষ্ট মৌসুম। ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-আযকার এবং তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির ভরা বসন্ত। মুমিন বান্দার জন্য রমযান মাস আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নেয়ামত। তিনি এই মাসের প্রতিটি দিবস-রজনীতে দান করেছেন মুষলধারা বৃষ্টির মত অশেষ খায়ের-বরকত এবং অফুরন্ত কল্যাণ। মুমিনের কর্তব্য, এই মহা নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত হওয়া। ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
(তরজমা) (হে নবী) আপনি বলুন! এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতেই হয়েছে। সুতরাং এতে তারা যেন আনন্দিত হয়। তারা যা কিছু সঞ্চয় করে, এটা তার চেয়ে উত্তম।-সূরা ইউনুস (১০)-৫৮
এ মাসে বান্দা পার্থিব সকল চাহিদা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর দয়া ও রহমত লাভ করবে, অতীতের সকল পাপাচার থেকে ক্ষমা চেয়ে নতুনভাবে ঈমানী জিন্দেগীর উত্তাপ গ্রহণ করবে, তাকওয়ার অনুশীলনের মাধ্যমে পুরো বছরের ইবাদত ও ইতাআতের শক্তি সঞ্চয় করবে, চিন্তা-চেতনা ও কর্ম-সাধনায় আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পিত করবে-এই হচ্ছে মুমিনের আনন্দ।
আল্লাহ তাআলা এই পবিত্র মাসকে যেসব গুণ ও মর্যাদা দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছেন, যত রহমত, বরকত এবং দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা একে মহিমান্বিত করেছেন, এ মাসের নেক আমলগুলোর যত সওয়াব ও প্রতিদান নির্ধারিত করেছেন তার হিসাব-নিকাশ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে এবং হাদীস শরীফের বিস্তৃত বর্ণনায় যে গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট বর্ণিত হয়েছে, তার কিছু দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করার চেষ্টা করব। আল্লাহ তাআলা সবাইকে উপকৃত করুন। আমীন।

দিনে সিয়াম ও রাতে দীর্ঘ কিয়ামুল লাইলের পাবন্দির নাম রামাযান

মুসলিম উম্মাহর নিকট রমযান মাসের আগমন ঘটে প্রধানত রোযা ও তারাবীহ’র বার্তা নিয়ে। এটি রমযান মাসের বিশেষ আমল। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য, পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে এ দুই বিষয়ে যত্নবান হওয়া। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি; যাতে তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী (মুত্তাকী) হতে পার।-সূরা বাকারা (২) ১৮৩- অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন,
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রমযান) পাবে, সে যেন অবশ্যই তার রোযা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য সময় সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে।-সূরা বাকারা-১৮৫
হযরত আবু হুরায়রা রা বলেন,
لما حضر رمضان، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قد جاءكم رمضان، شهر مبارك، افترض الله عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب الجنة، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه الشياطين، فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. قال الشيخ شعيب الارنؤوط فى تعليقه على المسند : هذا حديث صحيح، وإسناد رجاله رجال الشيخين.
যখন রমযান মাসের আগন ঘটলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমযান এসেছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শিকলে বন্দী করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এর কল্যান থেকে বঞ্চিত হল, সে তো প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস-৭১৪৮ সুনানে নাসায়ী-হাদীস-২৪১৬, মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৮৩৮৩ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৮৯৫৯

পবিত্র কালামুল্লাল শরিফ অধিক অবতির্ন হওয়ার মাস রমাযান

রমাযানুল মুবারকের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল তা কুরআন নাযিলের মাস। এই পবিত্র মাসেই আল্লাহ তাআলা পূর্ণ কুরআন মজীদ লওহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ করেন। অতপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কুরআনের সর্বপ্রথম অহীও এ মাসেই নাযিল হয়। রমযান মাসের অন্য কোনো ফযীলত যদি উল্লেখিত না হত, তবে এই এক ফযীলতই তার মর্যাদা ও বিশেষত্বের জন্য যথেষ্ট হতো। রমযান মাসের পরিচয় ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম এই বৈশিষ্ট্যের কথাই উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
(তরজমা) রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন অবশ্যই এর রোযা রাখে।-সূরা বাকারা (২) : ১৮৫
শুধু কুরআন মজীদ নয়, হযরত ইবরাহীম আ. এর সহীফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলসহ সকল আসমানী কিতাব এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে। তাবারানী বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে এই বৈশিষ্ট্যও উল্লেখিত হয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমাযান

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
ما اتى على المسلمين شهر خير لهم من رمضان ولا اتى على المنافقين شهر شرلهم من رمضان، وذلك لما يعد المؤمنون فيه من القوة للعبادة وما يعد فيه المنافقون من عفلات الناس وعوراتهم هو غنم المؤمن يغتنمه الفاجر.
قال الشيخ احمد شاكر فى تعليقه على المسند (8350) اسناده صحيح وفى (8856) اسناده حسن لغيره.
আল্লাহ তাআলার কসম! মুসলমানদের জন্য রমযানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমযান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৩৬৮, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস-৮৯৬৮, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-১৮৮৪, তাবারানী হাদীস-৯০০৪, বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস-৩৩৩৫

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অফুরন্ত রহমতের মাস মাহে রমাযান

এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।
ইতিপূর্বে উল্লেখিত একটি হাদীসে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া আরো হাদীসে তা আছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين.
যখন রমযান মাসের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।-সহীহ বুখারী, হাদীস-১৮৯৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস-১০৭৯ (১), মুসনাদে আহমদ হাদীস-৮৬৮৪, সুনানে দারেমী, হাদীস-১৭৭৫
হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إذا كان رمضان فتحت أبواب الرحمة، وغلقت أبواب جهنم، وسلسلت الشياطين.
وفي رواية البخاري : إذا دخل شهر رمضان، فتحت أبواب السماء …
রমযান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়।-সহীহ মুসলিম হাদীস-১০৭৯-২
সহীহ বুখারী’র বর্ণনায় রয়েছে, রমযান আরম্ভ হলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, …। হাদীস-১৮৯৯
মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন, মুমিন বান্দাগণ যাতে রমযান মাসের অতি মূল্যবান ও বরকতপূর্ণ সময় নেক কাজে ব্যয় করতে পারে এবং মুনাফিকদের মত খায়ের ও বরকত থেকে বঞ্চিত না থাকে, তাই আল্লাহ তাআলা এ মাসের শুরু থেকেই সৃষ্টিজগতে এমন আবহ সৃষ্টি করেন, যা পুরো পরিবেশকেই রহমত-বরকত দ্বারা আচ্ছাদিত করে দেয় এবং মুমিনদেরকে ইবাদত-বন্দেগী ও নেক আমলের উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাবে। তাদের পূণ্য ও প্রতিদানের সুসংবাদ দিতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং পাপাচার ও খারাপ কাজ হতে বিরত রাখতে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সব ধরনের ফিতনা-ফাসাদ ও অনিষ্ট হতে রক্ষা করতে কুমন্ত্রণাদাতা দুষ্ট জ্বিন ও শয়তানদেরকে শিকল লাগিয়ে আবদ্ধ করা হয়। তারপর কল্যাণের পথে অগ্রগামী হওয়ার ও অন্যায় থেকে নিবৃত্ত থাকার আহবান জানানো হয়। যেমন আবু হুরায়রা রা. থেকেই বর্ণিত এক হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إذا كان أول ليلة من شهر رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن، وغلقت أبواب النار، فلم يفتح منها باب، وفتحت أبواب الجنة، فلم يغلق منها باب، وينادي منادٍ : يا باغي الخير! أقبل، ويا باغي الشر! اقصر، ولله عتقاء من النار، وذلك كل ليلة.
যখন রমযান মাসের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন দুষ্ট জ্বিন ও শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে-হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও, হে অকল্যাণের প্রার্থী! থেমে যাও। আর আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দান করেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৮৭৯৪, ৫; বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস-৩৬০১, সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৬৮২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৬৪২ মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস-১৫৭২ মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস-৮৯৬০

চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ ও সর্বসময় দুআ কবুলের মাস রমাযান

পূর্বের হাদীসেই বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাত্রে অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দান করেন। সুতরাং আমাদের কর্তব্য, বেশি বেশি নেক আমল এবং তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেদেরকে এই শাহী ফরমানের অন্তর্ভুক্ত করা।
এ প্রসঙ্গে অন্য হাদীসে হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إن لله عند كل فطر عتقاء، وذلك في كل ليلة.
وقال البوصيري : رجال إسناده ثقات
অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমযান মাসে প্রতি ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। প্রতি রাতেই তা হয়ে থাকে।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৬৪৩, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-২২২০২, তবারানী হাদীস-৮০৮৮. বায়হাকী-৩৬০৫
হযরত আবু হুরায়রা রা. অথবা আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إن لله عتقاء في كل يوم وليلة (يعني في رمضان) لكل عبد منهم دعوة مستجابة.
قال الشيخ شعيب الارنؤوط : وإسناده صحيح على شرط الشيخين.
অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমযান মাসের প্রত্যেক দিবস ও রাত্রিতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দুআ কবুল করেন। -মুসনাদে আহমদ হাদীস ৭৪৫০, মুসনাদে বাযযার, হাদীস-৯৬২
হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إن لله في كل يوم وليلة عتقاء من النار في شهر رمضان، وإن لكل مسلم دعوة يدعو بها فيستجاب له.
وقال الهيثمى فى المجمع : رواه البزار، ورجاله ثقات.
রমযান মাসের প্রতিটি দিবস ও রজনীতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। প্রত্যেক মুসলিমের একটি দুআ, যা সে করে, কবুল করা হয়।-মুসনাদে বায্যার, হাদীস ৩১৪১, মাযমাউয যাওয়াইদ, ১৭২১৫

নিজের অর্থ সার্বিকভাবে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় দান-খয়রত ও হাদিয়া দেয়ার মাস রমাযান

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন,
كان رسول الله صلى الله عيله وسلم أجود الناس، وكان أجود ما يكون في رمضان، حين يلقاه جبريل، وكان يلقاه في كل ليلة من رمضان فيدارسه القرآن، فلرسول الله صلى الله عليه وسلم أجود بالخير من الريح المرسلة.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তাঁর দানশীলতা (অন্য সময় হতে) অধিকতর বৃদ্ধি পেত রমযান মাসে, যখন জিব্রীল আ. তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন। জিব্রীল আ. রমযানের প্রতি রাত্রে আগমন করতেন এবং তাঁরা পরস্পর কুরআন শুনাতেন। তো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল।-সহীহ বুখারী, হাদীস-৬, সহীহ মুসলিম হাদীস-২৩০৮, মুসনাদে আহমদ, ২৬১৬
হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আলজুহানী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
من فطر صائما كان له مثل أجره، غير أنه لا ينقص من أجر الصائم شيئًا.
قال الترمذى : هذا حديث حسن صحيح.
যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোযাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভ করবে। তবে রোযাদারের প্রতিদান হতে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না।-সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৮০৭, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-১৭০৩৩, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৭৪৬, সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস-৩৪২৯, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-২০৬৪
হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
من فطر صائما أطعمه وسقاه كان له مثل أجره.
رواه عبد الرزاق في مصنفه : وهو في حكم المرفوع، فمثله لا يعرف بالرأي،
যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে পানাহার করিয়ে ইফতার করাবে, সে তার অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হাদীস-৭৯০৬

এইজন্য মসজিদ-মাদ্রাসা, আশেপাশের গরীব অসহায়দের সাম্ভব্য সহযোগিতা করে, সাথে সাথে হযরাত উলামা-তলাবা-আল্লাহওআলাগনকে সাম্ভব্য হাদিয়া প্রদান করে উপরোক্ত হাদীস সমূহের উপর আমল করা যেতে পারে৷

সকল আমলসমূহের সওয়াব অধিক হারে বৃদ্ধির মাস রমাযান

রমযান মাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এ মাস মুমিনের নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধির মাস এবং আখেরাতের সওদা করার শ্রেষ্ঠ সময়। দুনিয়ার ব্যবসায়ীদের যেমন বিশেষ বিশেষ মৌসুম থাকে, যখন খুব জমজমাট ব্যবসা হয় এবং বছরের অন্য সময়ের তুলনায় আয়-উপার্জন ও মুনাফা বেশি হয়, তেমনি আখেরাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার শ্রেষ্ঠ মওসুম হচ্ছে রমযান মাস। এ মাসে আমলের দ্বারা অনেক বেশি মুনাফা লাভ করা যায়। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
عن ابن عباس رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لامرأة من الأنصار، سماها ابن عباس فنسيت اسمها (وفي الرواية الأخرى : يقال لها أم سنان)، ما منعك أن تحجي معنا؟ قالت : لم يكن لنا إلا ناضحان، فحج أبو ولدها وابنها على ناضح وترك لنا ناضحا ننضح عليه، قال : إذا جاء رمضان فاعتمري، فإن عمرة فيه تعدل حجة.
وفي رواية أخرى لمسلم : فعمرة في رمضان تقضي حجة أو حجة معي.
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারী মহিলাকে বললেন, বর্ণনাকারী বলেন, তার নাম ইবনে আববাস রা. উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু আমি তা ভুলে গিয়েছি-(অন্য বর্ণনায় তার নাম উম্মে সিনান উল্লেখ করা হয়েছে) তুমি কেন আমাদের সাথে হজ্ব করতে যাওনি? তিনি বললেন, আমাদের পানি বহনকারী দুটি মাত্র উট রয়েছে। একটিতে আমার ছেলের বাবা (স্বামী) ও তাঁর ছেলে হজ্ব করতে গিয়েছেন, অন্যটি পানি বহনের জন্য আমাদের কাছে রেখে গিয়েছেন। তিনি বলেন, রমযান মাস এলে তুমি উমরা করবে। কেননা এ মাসের উমরা একটি হজ্বের সমতুল্য। সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রমযান মাসের উমরা একটি হজ্বের সমতুল্য। অথবা বলেছেন, আমার সাথে একটি হজ্বের সমতুল্য (সওয়াবের হিসাবে)।-সহীহ বুখারী, হাদীস, ১৭৮২, সহীহ মুসলিম-১২৫৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-২০২৫
হযরত উম্মে মাকিল রা. হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
عمرة في رمضان تعدل حجة.
رواه الترمذي في سننه، وقال : حديث أم معقل حديث حسن غريب، ورواه أبو داود، وفي رواية أحمد عن أم معقل الأسدية، أنها قالت : يا رسول الله صلى الله عليه وسلم! إني أريد الحج وجملي أَعْجَفُ، فما تأمرني، قال : اعتمري في رمضان، فإن عمرة في رمضان تعدل حجة.
রমযান মাসে উমরা হজ্বের সমতুল্য। -সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৯৩৯, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৯৮৬।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, উম্মে মাকিল রা. বলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো হজ্ব করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমার উটটি দুর্বল। তিনি বললেন, তুমি রমযান মাসে উমরা করো। কেননা রমযান মাসে উমরা (সওয়াব হিসেবে) হজ্বের সমতুল্য। মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২৭২৮৫

খুব দ্রুত গুনাহ সমূহ থেকে পবিত্রতা এবং ক্ষমা লাভের মাস রমাযান

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন-
الصلوات الخمس والجمعة إلى الجمعة ورمضان إلى رمضان مكفرات ما بينهن، إذا اجتنب الكبائر.
পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রমযান থেকে আরেক রমযান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মুছে দেয় যদি সে কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৩ (৩)
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রমযান মাস হল মাগফিরাত লাভের মাস, যে মাসে সকলের জন্য ক্ষমার দুয়ার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ক্ষমা লাভের এমন সূবর্ণ সুযোগ পেয়ে যে ব্যক্তি নিজের পাপসমূহ ক্ষমা করাতে পারে না সে সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত। হাদীস শরীফে তার জন্য বদ দুআ করা হয়েছে।
হযরত কা’ব ইবনে উজরা রা. হতে ব©র্ণত, তিনি বলেন-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : احضروا المنبر، فحضرنا، فلما ارتقى درجة قال آمين، فلما ارتقى الدرجة الثانية قال آمين، فلما ارتقى الدرجة الثالثة قال آمين، فلما نزل، قلنا : يا رسول الله! لقد سمعنا منك اليوم ما كنا نسمعه، قال : إن جبريل عرض لي فقال : بعد من أدرك رمضان فلم يغفر له، قلت : أمين، فلما رقيت الثانية، قال : بعد من ذكرت عنده فلم يصل عليك، قلت : آمين، فلما رقيت الثالثة، قال : بعد من أدرك أبويه الكبير أو أحدهما فلم يدخلا الجنة، قلت : آمين.
رواه الحاكم، وقال : صحيح الإسناد، واورده الهيثمى فى المجمع وقال : رواه الطبرانى ورجاله ثقات.
একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা মিম্বরের নিকট সমবেত হও। আমরা সকলেই তথায় উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম সিড়িতে পা রাখলেন, তখন বললেন, আমীন, যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন, যখন তিনি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন।
হযরত কা’ব ইবনে উজরা রা. বলেন, যখন তিনি (মিম্বর থেকে) অবতরণ করলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমরা (মিম্বরে উঠার সময়) আপনাকে এমন কিছু কথা বলতে শুনেছি, যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। উত্তরে তিনি বললেন, জিব্রীল আ. আমার নিকট আগমন করেছিলেন, যখন আমি প্রথম সিড়িতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমযান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ হল না। আমি বললাম, আমীন। যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হল অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পড়ল না। আমি বললাম আমীন। যখন তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তারা উভয়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না। অর্থাৎ তাদের খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে জান্নাতবাসী করতে পারল না। আমি বললাম, আমীন। মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস – ৭৩৩৮, মাযমাউয যাওয়াইদ, হাদীস-১৭৩১৭
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকেও এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। দেখুন : আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৬৪৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-৭৪৫১, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস-১৮৮৮, সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৩৫৪৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৫৫১
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,
أول ما يصيب صاحب رمضان الذي يحسن قيامه وصيامه أن يفرغ منه وهو كيوم ولدته من الذنوب.
রমযান মাস লাভকারী ব্যক্তি-যে উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম (রোযা, তারাবী ও অন্যান্য আমল) পালন করে-তার প্রথম পুরস্কার এই যে, সে রমযান শেষে গুনাহ থেকে ঐ দিনের মতো পবিত্র হয় যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল।-মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদীস-৮৯৬৬

সর্বশ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদরের মাস পবিত্র রমাযান

আল্লাহ রাববুল আলামীনের পক্ষ হতে মুসলিম উম্মাহর জন্য আরেকটি বিশেষ দান হল এক হাজার রাত অপেক্ষা উত্তম লাইলাতুল কদর। এই রাত এত মর্যাদাশীল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, এক হাজার রাত ইবাদত করলে যে সওয়াব হতে পারে, এই এক রাতের ইবাদতে তার চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
আল্লাহ তাআলা এ রাত সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন-
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
(তরজমা) লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিব্রীল আ.) তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক কল্যাণময় বস্ত্ত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরন করেন। যে রাত পুরোটাই শান্তি, যা ফযর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।-সূরা কদর (৯৭) : ৩-৫
এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বর্ণনা করেন-
دخل رمضان، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن هذا الشهر قد حضركم، وفيه ليلة خير من ألف شهر، من حرمها فقد حرم الخير كله، ولا يحرم خيرها إلا محروم.
قال المنذري : إسناده حسن، إن شاء الله، وكذا قاله البوصيري.
রমযান মাসের আগমন ঘটলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের নিকট এই মাস সমাগত হয়েছে, তাতে এমন একটি রাত রয়েছে, যা এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যান থেকে বঞ্চিত হল, সে প্রকৃতপক্ষে সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত। একমাত্র (সর্বহারা) দুর্ভাগাই এ রাতের কল্যান থেকে বঞ্চিত হয়।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৬৪৪
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে এ রাতের খায়ের-বরকত লাভে সচেষ্ট থাকা।

এছাড়া আরো অসংখ্য ফজিলত পবিত্র হাদীস শরীফে এসেছে, আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে রমাযান মাসের হাকিকত বুঝে, সঠিকভাবে, গুনাহ সমূহ ত্যাগ করে, আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, সুস্থতার সাথে, রমাযান মাস অতিবাহিত করার তৌফিক দান করুন আমিন৷

নিচে রমাযানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা-মাসাইল দেয়া হলো, আশা করি এগুলো কাজে আসবে ইনশাআল্লাহ, তাই সকলেই পড়ে নিলে ভালো হবে৷

যেভাবে শুরু

মাসআলা : প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্ক বালেগমুসলিমের উপর রমযানের রোযা ফরয।আল্লাহ তাআলা বলেন-

فمن شهد منكم الشهر فليصمه

অর্থ : সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এমাস পাবে সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।-সূরা বাকারা : ১৮৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া১/১৯৫; রদ্দুল মুহতার ২/৩৭২

মাসআলা : শাবানের ২৯ তারিখ দিবাগতসন্ধ্যায় চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে পরদিনথেকে রোযা রাখতে হবে। নতুবা শাবানের৩০ দিন পূর্ণ করার পর রোযা রাখা শুরুকরবে।

عن ابن عمر رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه ذكر رمضان، فقال : لا تصوموا حتى تروا الهلال، ولا تفطروا حتى تروه.

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘(রমযানের) চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা রাখবেনা এবং (শাওয়ালের) চাঁদ না দেখা পর্যন্তরোযা রাখা বন্ধ করবে না।’-সহীহ মুসলিম১/৩৪৭

অন্য হাদীসে আছে, ‘(শাবানের ২৯ দিন পূর্ণকরার পর) তোমরা যদি রমযানের চাঁদ নাদেখ তাহলে শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণকরবে।’-আলমুসান্নাফ, আবদুর রাযযাকহাদীস : ৭৩০১; আলবাহরুর রায়েক২/২৬৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৭

মাসআলা : আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে রোযাশুরুর জন্য এমন একজন ব্যক্তির চাঁদ দেখাইযথেষ্ট হবে, যার দ্বীনদার হওয়া প্রমাণিতকিংবা অন্তত বাহ্যিকভাবে দ্বীনদার।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘একজন মরুবাসী ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট (রমযানের) চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসাকরলেন, ‘তুমি কি একথার সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমিআল্লাহর রাসূল?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ।’ রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনসকলকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন।’-মুসতাদরাকে হাকিম ১/৪২৪; সুনানে আবুদাউদ ২৩৩৩; সুনানে নাসায়ী ২৪২২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৯৫৫৭; আলবাহরুর রায়েক ২/২৬৩; রদ্দুল মুহতার২/৩৮৫

মাসআলা : আকাশ পরিষ্কার থাকলেএকজনের খবর যথেষ্ট নয়; বরং এতলোকের খবর প্রয়োজন, যার দ্বারা প্রবলবিশ্বাস জন্মে যে, চাঁদ দেখা গেছে। কেননা, যে বিষয়ে অনেকের আগ্রহ ও সংশ্লিষ্টতাথাকে তাতে দু’ একজনের খবরের উপরনির্ভর করা যায় না।-আলমুহীতুল বুরহানী৩/৩৩৮; রদ্দুল মুহতার ৩/৩৮৮

মাসআলা : কোনো ব্যক্তি একাকী চাঁদদেখেছে, কিন্তু তার সাক্ষ্য গৃহিত হয়নি, এক্ষেত্রে তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে রোযা রাখাউত্তম, জরুরি নয়।

এক ব্যক্তি উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এরনিকট এসে বলল, ‘আমি রযমানের চাঁদদেখেছি।’ উমর রা. জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার সাথে অন্য কেউ কি দেখেছে?’ লোকটি বলল, ‘না, আমি একাই দেখেছি।’ উমর রা. বললেন, ‘তুমি এখন কী করবে?’ লোকটি বলল, ‘(আমি একা রোযা রাখব না) সবাই যখন রোযা রাখবে আমিও তখন রোযারাখব।’ উমর রা. তাকে বাহবা দিয়েবললেন, ‘তুমি তো বড় ফিকহ ও প্রজ্ঞারঅধিকারী।’-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক৪/১৬৮; আলমুহাল্লা ৪/৩৭৮

ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, এমন ব্যক্তির জন্যরোযা রাখা জরুরি না হলেও উত্তম হল রোযারাখা।-বাদায়েউস সানায়ে ২/২২১

মাসআলা : শাবান মাসের ২৯ ও ৩০ তারিখেরোযা রাখবে না; না রমযানের নিয়তে নানফলের নিয়তে। অবশ্য যে পূর্ব থেকেইকোনো নির্দিষ্ট দিবসে (যথা সোম ওমঙ্গলবার) নফল রোযা রেখে আসছে, আরঘটনাক্রমে শাবানের ২৯ ও ৩০ তারিখে ঐদিন পড়েছে তার জন্য এই তারিখেও নফলরোযা রাখা জায়েয।

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : نهي رسول الله عليه وسلم أن يتعجل شهر رمضان بصوم يوم أو يومين، إلا رجل كان يصوم صوما فيأتي ذلك على صومه.

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন, তোমরা রমযান মাসের একদিন বাদুই দিন পূর্ব থেকে রোযা রেখো না। তবেকারো যদি পূর্ব থেকেই নির্দিষ্ট কোনো দিনরোযা রাখার অভ্যাস থাকে আর ঐ দিন উক্ততারিখ পড়ে যায় তাহলে সে ঐ দিন রোযারাখতে পারে।’-সহীহ বুখারী ১/১৫৬, হাদীস: ১৯১; মুসানাফে আবদুর রাযযাক ৪/১৫৮, হাদীস : ৭৩১৫; জামে তিরমিযী ২/৩২; রদ্দুল মুহতার ২/৩৮২; বাদায়েউস সানায়ে২/২১৭

নিয়ত কিভাবে করবো?

মাসআলা : রোযার নিয়ত করা ফরয। নিয়তঅর্থ সংকল্প। যেমন মনে মনে এ সংকল্পকরবে, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেআগামী কালের রোযা রাখছি। মুখে বলাজরুরি নয়।

হাদীস শরীফে আছে, সকল আমল নিয়তেরউপর নির্ভরশীল। সহীহ বুখারী ১/২; বাদায়েউস সানায়ে ২/২২৬

মাসআলা : ফরয রোযার নিয়ত রাতেই করাউত্তম।

উম্মুল মুমিনীন হাফসা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

من لم يجمع الصيام قبل الفجر فلا صيام له.

যে ব্যক্তি ফজরের আগে রোযা রাখার নিয়তকরবে না তার রোযা (পূর্ণাঙ্গ) হবে না।-সুনানে আবু দাউদ ১/৩৩৩; আলবাহরুররায়েক ২/২৫৯-২৬০; বাদায়েউস সানায়ে২/২২৯

মাসআলা : রাতে নিয়ত করতে না পারলেদিনে সূর্য ঢলার প্রায় এক ঘণ্টা আগে নিয়তকরলেও রোযা হয়ে যাবে।

সালামা ইবনুল আকওয়া রা. বলেন, (আশুরার রোযা যখন ফরয ছিল তখন) রাূসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামআসলাম গোত্রের একজন ব্যক্তিকে ঘোষণাকরতে বললেন, ‘যে সকাল থেকে কিছুখায়নি সে বাকি দিন রোযা রাখবে। আর যেখেয়েছে সেও বাকি দিন রোযা রাখবে। কারণআজ আশুরা-দিবস।’-সহীহ বুখারী ২০০৭

আবদুল করীম জাযারী রাহ. বলেন, কিছুলোক সকালে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিল। তখনউমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. বললেন, ‘যে ব্যক্তি (ইতিমধ্যে কিছু) খেয়েছে সে বাকিদিন খাওয়া থেকে বিরত থাকবে। আর যেখায়নি সে বাকি দিন রোযা রাখবে।’-মুহাল্লা৪/২৯৩; বাদায়েউস সানায়ে ২/২২৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৬

মাসআলা : পুরো রমযানের জন্য একত্রেনিয়ত করা যথেষ্ট নয়; বরং প্রত্যেক রোযারনিয়ত পৃথক পৃথকভাবে করতে হবে। কারণপ্রতিটি রোযা ভিন্ন ভিন্ন আমল (ইবাদত)।আর প্রতিটি আমলের জন্যই নিয়ত করাজরুরি।

হাদীস শরীফে আছে, সকল আমল নিয়তেরউপর নির্ভরশীল।-সহীহ বুখারী ১/২; আরোদেখুন : আলমুহাল্লা ৪/২৮৫; মাবসূত, সারাখসী ৩/৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৫

মাসআলা : রাতে রোযার নিয়ত করলেওসুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী-মিলনেরঅবকাশ থাকে। এতে নিয়তের কোনো ক্ষতিহবে না।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ

রমযানের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী সম্ভোগহালাল করা হয়েছে।-বাকারা ২ : ১৮৭

মাসআলা : নিয়তের সময় শুরু হয় পূর্বেরদিনের সূর্যাস্তের পর থেকে। যেমন-মঙ্গলবারের রোযার নিয়ত সোমবার দিবাগতরাত তথা সূর্যাস্তের পর থেকে করা যায়।সোমবার সূর্যাস্তের পূর্বে মঙ্গলবারের রোযারনিয়ত করা যথেষ্ট নয়। কেননা, হাদীসশরীফে রাতে নিয়ত করার কথা বলাহয়েছে।-আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৪৩; রদ্দুলমুহতার ২/৩৭৭

সাহরী সুন্নত

মাসআলা : সাহরী খাওয়া সুন্নত। পেট ভরেখাওয়া জরুরি নয়, এক ঢোক পানি পানকরলেও সাহরীর সুন্নত আদায় হবে।

হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

تسحروا، فإن في السحور بركة.

‘তোমরা সাহরী খাও। কেননা, সাহরীতেবরকত রয়েছে।’-সহীহ মুসলিম ১/৩৫০

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, সাহরী খাওয়াবরকতপূর্ণ কাজ। সুতরাং তোমরা তাপরিত্যাগ করো না। এক ঢোক পানি দিয়েহলেও সাহরী কর। কারণ যারা সাহরী খায়আল্লাহ তাআলা তাদের উপর রহমত বর্ষণকরেন এবং ফেরেশতারা তাদের জন্যরহমতের দুআ করেন।’-মুসনাদে আহমদ৩/১২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস: ৯০১০; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস৩৪৭৬

মাসআলা : সুবহে সাদিকের কাছাকাছি সময়সাহরী খাওয়া মুস্তাহাব। তবে এত দেরি করামাকরূহ যে, সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ারআশঙ্কা হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামইরশাদ করেছেন-

إنما معاشر الأنبياء أمرنا أن تعجل فطرنا وأن تؤخر سحورنا، قال الهيثمي رجاله رجال الصحيح.

‘সকল নবীকে সময় হওয়ার পরপরইইফতার তাড়াতাড়ি করতে এবং সাহরী শেষসময়ে খেতে আদেশ করা হয়েছে।’-আলমুজামুল আওসাত ২/৫২৬; মাজমাউযযাওয়াইদ ৩/৩৬৮

আমর ইবনে মায়মুন আলআওদী বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম দ্রুত ইফতার করতেনআর বিলম্বে সাহরী খেতেন।’-মুসান্নাফেআবদুর রাযযাক, হাদীস : ৭৫৯১; মুসান্নাফেইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯০২৫

যেভাবে ইফতার করবো!

মাসআলা : দেরি না করে সূর্যাস্তের সাথেসাথে ইফতার করা মুস্তাহাব।

হাদীস শরীফে আছে,

لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر.

‘যতদিন মানুষ দেরি না করে সূর্যাস্তের সঙ্গেসঙ্গে ইফতার করবে ততদিন তারা কল্যাণেরউপর থাকবে।’-সহীহ বুখারী ১/২৬৩

মাসআলা : মাগরিবের নামায পড়ার আগেইইফতার করে নিবে, যেন সূর্যাস্তের সাথেসাথে ইফতার করার সওয়াব পাওয়া যায়।

আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবেরনামায পড়ার আগে তাজা খেজুর দিয়েইফতার করতেন। তাজা খেজুর না পেলেশুকনা খেজুর দ্বারা। আর তাও না পেলে একঢোক পানি দ্বারা ইফতার করতেন।’

-সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৬৯২

মাসআলা : খেজুর দ্বারা ইফতার করামুস্তাহাব। খেজুর না পেলে পানি দ্বারা ইফতারকরবে।

من وجد تمرا فليفطر عليه ومن لا يفطر على ماء، فإن الماء طهور.

আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন, ‘যার কাছে খেজুর আছে সে খেজুরদ্বারা ইফতার করবে। খেজুর না পেলে পানিদ্বারা ইফতার করবে। কেননা পানি হলপবিত্র।’-সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৬৯৪

আরো দেখুন : মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৭৫৮৬

ইফতারের সময় দুআ

ইফতারের সময় দুআ কবুল হয় তাই এ সময়বেশি বেশি দুআ-ইস্তিগফার করতে থাকবে।বিশেষত এই দুআ করবে-

اَللهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ بِرَحْمَتِكَ الَّتِيْ وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ أَنْ تَغْفِرَ لِيْ. رواه ابن ماجه، وقال البوصيري في الزوائد : هذا هديث صحيح، ورجاله ثقات.

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার সেইরহমতের উসীলায় প্রার্থনা করছি যা সকলবস্ত্ততে পরিবেষ্টিত, তুমি আমাকে মাফ করেদাও।-সুনানে ইবনে মাজাহ পৃ. ১২৫, হাদীস: ১৭৫৩

আর ইফতার গ্রহণের সময় এ দুআ পড়বে-

اَللهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلىٰ رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ.

হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রোযারেখেছিলাম এবং তোমার রিযিক দ্বারাইইফতার করলাম।-সুনানে আবু দাউদ হাদীস: ২৩৫৮

ইফতারের পর নবী কারীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুআ পড়তেন-

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللهُ. رواه أبو داود، وصححه الحاكم في المستدرك، ولم يتعقبه الذهبي.

পিপাসা দূর হল, শিরা-উপশিরা সতেজ হলআর আল্লাহ তাআলা চান তো রোযারসওয়াব লিপিবদ্ধ হল।-সুনানে আবু দাউদ১/৩২১, হাদীস : ২৩৫৭; মুসতাদরাকেহাকেম, হাদীস : ১৫৭৬

রোযা ভঙ্গের কারণসমূহ

যেসব কারণে কাযা ও কাফফারা উভয়টিজরুরি

মাসআলা : রমযানে রোযা রেখে দিনে স্ত্রীসহবাস করলে বীর্যপাত না হলেও স্বামী-স্ত্রীউভয়ের উপর কাযা ও কাফফারা ওয়াজিবহবে।

একটি দীর্ঘ হাদীসে আছে, এক ব্যক্তিরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি রোযা অবস্থায়স্ত্রী সহবাস করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফফারাআদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। দেখুন : সহীহবুখারী ৬৭০৯; জামে তিরমিযী ৭২৪; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৭৪৫৭; মুসনাদেআহমদ ২/২৪১

মুহাম্মাদ ইবনে কা’ব রা. বলেন, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে(যে স্ত্রীসহবাসে লিপ্ত হয়েছিল) কাফফারাআদায়ের সাথে কাযা আদায়েরও আদেশকরেছিলেন।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৭৪৬১; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৬

মাসআলা : রোযা রেখে স্বাভাবিক অবস্থায়ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে কাযা ওকাফফারা উভয়টি জরুরি হবে।

হাদীস শরীফে আছে-

এক ব্যক্তি রমযানে রোযা রেখে(ইচ্ছাকৃতভাবে) পানাহার করল। তখনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতাকে আদেশ করলেন, যেন একটি দাসআযাদ করে বা দুই মাস রোযা রাখে বাষাটজন মিসকীনকে খানা খাওয়ায়।-সুনানেদারাকুতনী ২/১৯১

ইমাম যুহরী রাহ. বলেন, ‘রমযানে রোযারেখে যে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করবে তারহুকুম ইচ্ছাকৃতভাবে দিনে সহবাসকারীরঅনুরূপ।’ অর্থাৎ তাকে কাযা ও কাফফারাউভয়টি আদায় করতে হবে।-মাবসূত, সারাখসী ৩/৭৩; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৬

মাসআলা : বিড়ি-সিগারেট, হুক্কা পানকরলেও রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা ওকাফফারা উভয়টি জরুরি হবে।-রদ্দুলমুহতার ৩/৩৮৫

এই মাসআলার দলীল বিষয়ক বিস্তারিতআলোচনার জন্য দেখুন : ঝাজরু আরবাবিররায়্যান আন শুরবিদ দুখান; তারবীহুল জিনানবিতাশরীহি হুকমি শুরবিদ দুখান, আল্লামাআবদুল হাই লাখনোবী রাহ.

মাসআলা : সুবহে সাদিক হয়ে গেছে জানাসত্ত্বেও আযান শোনা যায়নি বা এখনোভালোভাবে আলো ছড়ায়নি এ ধরনেরভিত্তিহীন অজুহাতে খানাপিনা করলে বা স্ত্রীসহবাসে লিপ্ত হলে কাযা-কাফফারা দু’টোইজরুরি হবে।-সূরা বাকারা : ১৮৭; মাআরিফুল কুরআন ১/৪৫৪-৪৫৫

কাফফারা আদায়ের নিয়ম

মাসআলা : একটি রোযার জন্য দুই মাসধারাবাহিকভাবে রোযা রাখতে হবে। কোনোকারণে ধারাবাহিকতা ছুটে গেলে পুনরায়নতুন করে রোযা রাখতে হবে। পেছনেররোযাগুলো কাফফারার রোযা হিসাবে ধর্তব্যহবে না। তবে মহিলাদের হায়েযের কারণেধারাবাহিকতা নষ্ট হলে অসুবিধা নেই।

ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, ‘যার উপরকাফফারা হিসাবে দুই মাস ধারাবাহিকভাবেরোযা রাখা জরুরি সে যদি মাঝে অসুস্থহওয়ার কারণে রোযা রাখতে না পারে, তাহলে আবার নতুন করে রোযা রাখা শুরুকরবে।’-আলমুহাল্লা ৪/৩৩১; মাবসূত, সারাখসী ৭/১৪; আলবাহরুর রায়েক২/২৭৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৫/১৯৬

যেসব কারণে রোজা শুধু কাযা করতে হবে

মাসআলা : অযু বা গোসলের সময় রোযারকথা স্মরণ থাকা অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবেগলার ভেতর পানি চলে গেলে রোযা ভেঙ্গেযাবে। তাই রোযা অবস্থায় অযু-গোসলেরসময় নাকের নরম স্থানে পানি পৌঁছানো এবংগড়গড়াসহ কুলি করবে না।

লাকিত ইবনে সাবিরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন-

بالغ في الاستنشاق، إلا أن تكون صائما.

‘(অযু-গোসলের সময়) ভালোভাবে নাকেপানি দাও তবে রোযা অবস্থায় নয়।’-সুনানেআবু দাউদ, হাদীস : ২৩৬৩ সুনানেতিরমিযী, হাদীস : ৭৮৫

সুফিয়ান সাওরী রাহ. বলেন, ‘রোযা অবস্থায়কুলি করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে গলারভেতর পানি চলে গেলে রোযা ভেঙ্গে যাবেএবং তা কাযা করতে হবে।-মুসান্নাফেআবদুর রাযযাক, হাদীস : ৭৩৮০

আরো দেখুন : মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৯৮৪৪-৯৮৪৭; ফাতাওয়া শামী২/৪০১

মাসআলা : যা সাধারণত আহারযোগ্য নয় বাকোনো উপকারে আসে না, তা খেলেও রোযাভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করতে হবে।আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. ও ইকরিমারাহ. বলেন, ‘(পেটে) কোনো কিছু প্রবেশকরলে রোযা ভেঙ্গে যায়। কোনো কিছু বেরহওয়ার দ্বারা রোযা ভাঙ্গে না।’-সহীহ বুখারী১/২৬০ (তা’লীক); বাদায়েউস সানায়ে২/২৫৫; রদ্দুল মুহতার ২/৪১০

মাসআলা : দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে যদি তাথুথুর সাথে ভেতরে চলে যায় তবে রক্তেরপরিমাণ থুথুর সমান বা বেশি হলে রোযাভেঙ্গে যাবে।-আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৩; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৬

মাসআলা : হস্তমৈথুনে বীর্যপাত হলে রোযাভেঙ্গে যাবে। আর এটা যে ভয়াবহ গুনাহেরকাজ তা বলাই বাহুল্য।

হাদীস শরীফে কামেচ্ছা চরিতার্থ করা থেকেবিরত থাকাকে রোযার অংশ হিসেবে উল্লেখকরা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ঐ সত্ত্বারকসম, যার হাতে আমার জান। রোযাদারেরমুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার নিকট মেশকেরচেয়েও বেশি প্রিয় (আল্লাহ তাআলা বলেন,) রোযাদার আমার জন্য পানাহার করা থেকেএবং কামেচ্ছা চরিতার্থ করা থেকে বিরতথাকে।-সহীহ বুখারী ১/২৫৪; আলবাহরুররায়েক ২/২৭২; ফাতাওয়া শামী ২/৩৯৯

মাসআলা : মুখে বমি চলে আসার পর ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে রোযা ভেঙ্গেযাবে। যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।-আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৪; আদ্দুররুলমুখতার ২/৪১৫

মাসআলা : রোযা অবস্থায় হায়েয বা নেফাসশুরু হলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। পরে তা কাযাকরতে হবে।

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত একটিদীর্ঘ হাদীসে আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর বা ঈদুলআযহায় মহিলাদের লক্ষ্য করে বললেন-

أليس إذا حاضت لم تصل ولم تصم قلن بلى، قال : فذلك من نقصان دينها.

মহিলারা তো ঋতুস্রাবের সময় রোযা রাখতেপারে না এবং নামাযও পড়তে পারে না।এটা তোমাদের দ্বীনের অসম্পূর্ণতা।-সহীহবুখারী ১/৪৪; শরহু মুখতাসারিত তহাবী২/৪৪০; আননুতাফ ফিলফাতাওয়া ১০০

* পেটের এমন ক্ষতে ওষুধ লাগালে রোযাভেঙ্গে যাবে, যা দিয়ে ওষুধ পেটের ভেতরচলে যায়। বিশেষ প্রয়োজনে এমন ক্ষতেওষুধ লাগালে পরে সে রোযার কাযা করেনিতে হবে।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪০২

* নাকে ওষুধ বা পানি দিলে তা যদি গলারভেতরে চলে যায় তাহলে রোযা ভেঙ্গে যাবেএবং কাযা করতে হবে।

* মলদ্বারের ভেতর ওষুধ বা পানি ইত্যাদিগেলে রোযা ভেঙ্গে যাবে।

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত-

ذكر عنده الوضوء من الطعام، قال الأعمش مرة والحجامة للصائم، فقال : إنما الوضوء مما يخرج وليس مما يدخل، وإنما الفطر مما دخل وليس مما خرج.

শরীর থেকে (কোনো কিছু) বের হলে অযুকরতে হয়, প্রবেশ করলে নয়। পক্ষান্তরেরোযা এর উল্টো। রোযার ক্ষেত্রে (কোনোকিছু শরীরে) প্রবেশ করলে রোযা ভেঙ্গে যায়, বের হলে নয় (তবে বীর্যপাতের প্রসঙ্গটিভিন্ন)।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৪; রদ্দুলমুহতার ২/৪০২

মাসআলা : সুবহে সাদিকের পর সাহরীরসময় আছে ভেবে পানাহার বা স্ত্রীসঙ্গম করলেরোযা ভেঙ্গে যাবে। তেমনি ইফতারির সময়হয়ে গেছে ভেবে

সূর্যাস্তের পূর্বে ইফতার করে নিলে রোযা নষ্টহয়ে যাবে।-আদ্দুররুল মুখতার ২/৪০৫; আলবাহরুর রায়েক ২/২৯১

মাসআলা : রোযা রাখা অবস্থায় ভুলবশতপানাহার করে রোযা নষ্ট হয়ে গেছে ভেবেইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে রোযা নষ্টহয়ে যাবে এবং কাযা করা জরুরি হবে।

* অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়ার কারণে রোযা নষ্টহয়ে গেছে মনে করে রোযা ভেঙ্গে ফেললেকাযা করতে হবে।

আউন রাহ. থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনেসীরীন রাহ. রাত্র বাকি আছে ভেবে সাহরীখেলেন। তারপর জানতে পারলেন, তিনিসুবহে সাদিকের পর সাহরী করেছেন তখনতিনি বললেন, ‘আমি আজ রোযাদার নই।’ (অর্থাৎ আমাকে এ রোযার কাযা করতেহবে)।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬/১৪৯

আলী ইবনে হানযালা তার পিতা থেকে বর্ণনাকরেন, তিনি রোযার মাসে ওমর রা.-এরনিকট ছিলেন। তার নিকট পানীয় পেশ করাহল। উপস্থিত লোকদের কেউ কেউ সূর্য ডুবেগেছে ভেবে তা পান করে ফেলল। এরপরমুয়াযযিন আওয়াজ দিল, আমীরুল মুমিনীন! সূর্য এখনো ডুবেনি। তখন ওমর রা. বললেন, ‘যারা ইফতারি করে ফেলেছে তারা একটিরোযা কাযা করবে। আর যারা ইফতারিকরেনি তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬/১৫০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪০১; ফাতাওয়াহিন্দিয়া ১/২০৬

যেসব কারণে রোযা ভাঙে না

এমন কিছু কাজ আছে, যার দ্বারা রোযারকোনো ক্ষতি হয় না। অথচ অনেকেএগুলোকে রোযা ভঙ্গের কারণ মনে করে।ফলে এমন কোনো কাজ হয়ে গেলে রোযাভেঙে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃত পানাহারকরে। পক্ষান্তরে কেউ কেউ এসব কাজপরিহার করতে গিয়ে অযথা কষ্ট ভোগ করে।সুতরাং এসব বিষয়েও সকল রোযাদারঅবগত হওয়া জরুরি।

মাসআলা : কোনো রোযাদার রোযার কথাভুলে গিয়ে পানাহার করলে তার রোযা নষ্টহবে না। তবে রোযা স্মরণ হওয়ামাত্রইপানাহার ছেড়ে দিতে হবে।

হাদীস শরীফে এসেছে-

من نسي وهو صائم فأكل أو شرب فليتم صومه، فإنما أطمعه الله وسقاه.

‘যে ব্যক্তি ভুলে আহার করল বা পান করলসে যেন তার রোযা পূর্ণ করে। কারণআল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।’-সহীহমুসলিম ১/২০২; আলবাহরুর রায়েক২/২৭১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০২

মাসআলা : চোখে ওষুধ-সুরমা ইত্যাদিলাগালে রোযার কোনো ক্ষতি হয় না।

আনাস রা. রোযা অবস্থায় সুরমা ব্যবহারকরতেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/৩২৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৩; রদ্দুল মুহতার২/৩৯৫

মাসআলা : রাত্রে স্ত্রীসহবাস করলে বাস্বপ্নদোষ হলে সুবহে সাদিকের আগে গোসলকরতে না পারলেও রোযার কোনো ক্ষতি হবেনা। তবে কোনো ওযর ছাড়া, বিশেষতরোযার হালতে দীর্ঘ সময় অপবিত্র থাকাঅনুচিত।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, গোসল ফরয অবস্থায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের সকাল হত। অতঃপরতিনি গোসল করে রোযা পূর্ণ করতেন।

মাসআলা : বীর্যপাত ঘটা বা সহবাসে লিপ্তহওয়ার আশঙ্কা না থাকলে স্ত্রীকে চুমু খাওয়াজায়েয। তবে কামভাবের সাথে চুমু খাওয়াযাবে না। আর তরুণদের যেহেতু এ আশঙ্কাথাকে তাই তাদের বেঁচে থাকা উচিত।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বলেন, আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে ছিলাম।ইতিমধ্যে একজন যুবক এল এবং প্রশ্ন করল, আল্লাহর রাসূল! আমি কি রোযা অবস্থায় চুম্বনকরতে পারি? নবী কারীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। এরপরএক বৃদ্ধ এল এবং একই প্রশ্ন করল। নবীকারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, হাঁ। আমরা তখন অবাক হয়ে একেঅপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম। নবী কারীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি জানি, তোমরা কেন একে অপরেরদিকে তাকাচ্ছ। শোন, বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজেকেনিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।-মুসনাদে আহমদ২/১৮০, ২৫০

আবু মিজলায রাহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনেআববাস রা.-এর নিকট এক বৃদ্ধ রোযাঅবস্থায় চুমু খাওয়ার মাসআলা জিজ্ঞাসাকরল। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন।অতঃপর এক যুবক এসে একই মাসআলাজিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে নিষেধকরলেন।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক৪/১৮৫; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০০

মাসআলা : অনিচ্ছাকৃত বমি হলে (মুখ ভরেহলেও) রোযা ভাঙ্গবে না। তেমনি বমি মুখেএসে নিজে নিজে ভেতরে চলে গেলেও রোযাভাঙ্গবে না।

হাদীস শরীফে আছে, অর্থ : অনিচ্ছাকৃতভাবেকোনো ব্যক্তির বমি হলে তার রোযা কাযাকরতে হবে না।-জামে তিরমিযী ১/১৫৩, হাদীস : ৭২০; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪১৪

মাসআলা : শরীর বা মাথায় তেল ব্যবহারকরলে রোযা ভাঙ্গবে না।

কাতাদাহ রাহ. বলেন, ‘রোযাদারের তেলব্যবহার করা উচিত, যাতে রোযার কারণেসৃষ্ট ফ্যাকাশে বর্ণ দূর হয়ে যায়।-মুসান্নাফেআবদুর রাযযাক ৪/৩১৩; আদ্দুররুল মুখতার২/৩৯৫; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭৩

মাসআলা : শুধু যৌন চিন্তার কারণে বীর্যপাতহলে রোযা ভাঙ্গবে না। তবে এ কথা বলাইবাহুল্য যে, সব ধরনের কুচিন্তা তোএমনিতেই গুনাহ আর রোযার হালতে তো তাআরো বড় অপরাধ।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া১/২০৪; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৬

* কামভাবের সাথে কোনো মহিলার দিকেতাকানোর ফলে কোনো ক্রিয়া-কর্ম ছাড়াইবীর্যপাত হলে রোযা ভাঙ্গবে না। তবে রোযাঅবস্থায় স্ত্রীর দিকেও এমন দৃষ্টি দেওয়াঅনুচিত। আর অপাত্রে কু-দৃষ্টি তো গুনাহ। যারোযা অবস্থায় আরো ভয়াবহ। এতে ঐ ব্যক্তিরোযার ফযীলত ও বরকত থেকে মাহরূমহয়ে যায়।

জাবির ইবনে যায়েদকে জিজ্ঞাসা করাহয়েছে, কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীর দিকেকামভাবের সাথে তাকানোর ফলে বীর্যপাতঘটেছে, তার কি রোযা ভেঙ্গে গেছে? তিনিবললেন, ‘না। সে রোযা পূর্ণ করবে।’-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬-২৫৯ আরোদেখুন : সহীহ বুখারী ১/২৫৮; ফাতাওয়াহিন্দিয়া ১/২০৪; ফাতাওয়া শামী ২/৩৯৬

মাসআলা : মশা-মাছি, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদিঅনিচ্ছাকৃত পেটের ভেতর ঢুকে গেলেওরোযা ভাঙ্গবে না।

* অনুরূপ ধোঁয়া বা ধুলোবালিঅনিচ্ছাকৃতভাবে গলা বা পেটের ভেতর ঢুকেগেলে রোযা ভাঙ্গবে না।

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘কারোগলায় মাছি ঢুকে গেলে রোযা ভাঙ্গবে না।’-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬/৩৪৯; রদ্দুলমুহতার ২/৩৯৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৩

মাসআলা : স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভাঙ্গবে না।

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, নবীকারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখভরে বমি হল। তিনি তখন বললেন-

ثلاث لا يفطرن الصائم : القيء، والحجامة، والحلم.

তিন বস্ত্ত রোযাভঙ্গের কারণ নয় : বমি, শিঙ্গা লাগানো ও স্বপ্নদোষ।-সুনানে কুবরা, বাইহাকী ৪/২৬৪

মাসআলা : চোখের দু’ এক ফোটা পানি মুখেচলে গেলে রোযার ক্ষতি হয় না। তবে তাযদি গলার ভেতর চলে যায় তাহলে রোযাভেঙ্গে যাবে।-আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৪৯; ফাতাওয়া হিনিদয়া ১/২০৩

মাসআলা : সুস্থ অবস্থায় রোযার নিয়ত করারপর যদি অজ্ঞান বা অচেতন হয়ে যায় তাহলেরোযা নষ্ট হবে না।

নাফে রাহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. নফল রোযা অবস্থায় বেহুশ হয়ে যান কিন্তু একারণে রোযা ভাঙ্গেননি।-সুনানে কুবরা, বাইহাকী ৪/২৩৫; আলমুহীতুল বুরহানী৩/৩৬৮; মাবসূত, সারাখসী ৩/৮৮

যাদের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে

১. মুসাফির

মাসআলা : মুসাফিরের জন্য সফরের হালতেরোযা না রাখার সুযোগ রয়েছে। তবেঅস্বাভাবিক কষ্ট না হলে রোযা রাখাই উত্তম।আর অস্বাভাবিক কষ্ট হলে রোযা রাখামাকরূহ। এ অবস্থায় রোযা না রেখে পরে তাকাযা করবে।

আছিম রাহ. বলেন, আনাস রা.কেসফরকালে রোযা রাখার বিষয়ে জিজ্ঞাসাকরা হলে তিনি বললেন, ‘যে রোযা রাখবে নাসে অবকাশ গ্রহণ করল। আর যে রোযারাখল সে উত্তম কাজ করল।’-মুসান্নাফেইবনে আবী শাইবা ৬/১৩২; রদ্দুল মুহতার২/৪২১; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৪০৩

মাসআলা : সফরের হালতে রোযা রাখা শুরুকরলে তা আর ভাঙ্গা জায়েয নয়। কেউভেঙ্গে ফেললে গুনাহগার হবে। তবেকাফফারা আসবে না। শুধু কাযাই যথেষ্ট।

আনাস রা. বলেন, ‘কেউ রোযা রেখে সফরেবের হলে রোযা ভাঙ্গবে না। তবে যদিপিপাসার কারণে প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়তাহলে রোযা ভাঙ্গতে পারবে, পরে তা কাযাকরে নিবে।-ফাতাওয়া তাতারখানিয়া৩/৪০৩; রদ্দুল মুহতার ২/৪৩১

মাসআলা : মুসাফির সফরের কারণে রোযারাখেনি, কিন্তু দিন শেষ হওয়ার আগেইমুকীম হয়ে গেল। তাহলে দিনের অবশিষ্টসময় রমযানের মর্যাদা রক্ষার্থে পানাহারথেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। তবে পরবর্তীসময়ে এ রোযার কাযা অবশ্যই করতে হবে।

ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, যে মুসাফিররমযানের দিনে (সফরের হালতে) খানাখেয়েছে সে মুকীম হয়ে গেলে দিনের বাকিঅংশ পানাহার থেকে বিরত থাকবে।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬/২২১; আলবাহরুর রায়েক ২/২৯১; ফাতাওয়াতাতারখানিয়া ৩/৪২৮

মাসআলা : রমযানের দিনে হায়েয-নেফাসথেকে পবিত্র হলে অবশিষ্ট দিন রমযানেরমর্যাদা রক্ষার্থে পানাহার থেকে বিরত থাকাওয়াজিব। তবে উক্ত ওযরে ছুটে যাওয়ারোযাগুলোর সাথে এ দিনের রোযাও কাযাকরবে।

হাসান রা. বলেন, ‘সুবহে সাদিকের পর যেহায়েয থেকে পবিত্র হয়েছে সে দিনের বাকিঅংশে পানাহার করবে না।’-মুসান্নাফে ইবনেআবী শাইবা ৬/২২১; ফাতাওয়াতাতারখানিয়া ৩/৪২৮; আলবাহরুর রায়েক২/২৯১

২. অসুস্থ ব্যক্তি

মাসআলা : রোযার কারণে যে রোগ বৃদ্ধি পায়বা রোগ-ভোগ দীর্ঘ হওয়ার প্রবল আশঙ্কাথাকে সে রোগে রোযা ভাঙ্গার অবকাশআছে। উল্লেখ্য, আশঙ্কা যদি সুস্পষ্ট হয়তাহলে তো কথা নেই। নতুবা একজনঅভিজ্ঞ ও দ্বীনদার চিকিৎসকের মতামতেরপ্রয়োজন হবে।-আলমুহীতুল বুরহানী৩/৩৫৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২২

৩. গর্ভবতী

মাসআলা : রোযা রাখার কারণে গর্ভবতীমহিলা নিজের কিংবা সন্তানের প্রাণহানী বামারাত্মক স্বাস্থ্যহানীর প্রবল আশঙ্কা করলেতার জন্য রোযা ভঙ্গ করা জায়েয। পরে এরোযা কাযা করে নিবে।-আলমুহীতুল বুরহানী৩/৩৫৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২২

৪. দুগ্ধদানকারিনী

মাসআলা : দুগ্ধদানকারিনী মা রোযা রাখলেযদি সন্তান দুধ না পায় আর ঐ সন্তান অন্যকোনো খাবারেও অভ্যস্ত না হয়, ফলে দুধ নাপাওয়ার কারণে

সন্তানের মৃত্যুর বা মারাত্মক স্বাস্থ্যহানীরআশঙ্কা হয়, তাহলে তিনি রোযা ভাঙ্গতেপারবেন এবং পরে কাযা করে নিবেন।হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, অর্থ : আল্লাহতাআলা মুসাফিরের জন্য রোযার হুকুমশিথিল করেছেন এবং আংশিক নামাযকমিয়ে দিয়েছেন। আর গর্ভবতী ওদুগ্ধদানকারিনীর জন্যও রোযার হুকুম শিথিলকরেছেন।-জামে তিরমিযী ১/১৫২; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৫৯; আদ্দুররুলমুখতার ২/৪২২

৫. দুর্বল বৃদ্ধ ব্যক্তি

মাসআলা : বার্ধক্যজনিত কারণে রোযারাখতে সক্ষম না হলে রোযা না রাখারঅনুমতি রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক রোযারপরিবর্তে একজন গরীবকে দুবেলা খাবারখাওয়াবে অথবা পৌনে দু কেজি গমের মূল্যসদকা করবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ

আর যাদের রোযা রাখা অত্যন্ত কষ্টকর তারাফিদয়া-একজন মিসকীনকে খাবার প্রদানকরবে।-সূরা বাকারা : ১৮৪; আলমুহীতুলবুরহানী ৩/৩৬১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৭

ফিদয়া কি ও কেন?

মাসআলা : যে বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তির রোযারাখার সামর্থ্য নেই এবং পরবর্তীতে কাযাকরতে পারবে এমন সম্ভাবনাও নেই এমনব্যক্তি রোযার পরিবর্তে ফিদয়া প্রদানকরবে।-সূরা বাকারা : ১৮৪

ছাবেত বুনানী রাহ. বলেন, আনাস ইবনেমালেক রা. যখন বার্ধক্যের কারণে রোযারাখতে সক্ষম ছিলেন না তখন তিনি রোযা নারেখে (ফিদয়া) খাবার দান করতেন।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযযাক, হাদীস : ৭৫৭০

ইকরিমা রাহ. বলেন, ‘‘আমার মা প্রচন্ডতৃষ্ণা-রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং রোযারাখতে সক্ষম ছিলেন না। তাঁর সম্পর্কে আমিতাউস রাহ.কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনিবললেন, ‘প্রতি দিনের পরিবর্তে মিসকীনকেএক মুদ (বর্তমান হিসাবে পৌনে দুই কেজি) পরিমাণ গম প্রদান করবে’।’’-মুসান্নাফেআবদুর রাযযাক, হাদীস : ৭৫৮১

মাসআলা : এক রোযার পরিবর্তে এক ফিদয়াফরয হয়। এক ফিদয়া হল, কোনোমিসকীনকে দু বেলা পেট ভরে খানাখাওয়ানো অথবা এর মূল্য প্রদান করা।

হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন-

وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ

এই আয়াত রোযা রাখতে অক্ষম বৃদ্ধের জন্যপ্রযোজ্য।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস: ৭৫৮৫; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৬৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২৬

মাসআলা : যাদের জন্য রোযার পরিবর্তেফিদইয়া দেওয়ার অনুমতি রয়েছে তারারমযানের শুরুতেই পুরো মাসের ফিদয়াদিয়ে দিতে পারবে।-আদ্দুররুল মুখতার২/৪২৭; আলবাহরুর রায়েক ২/২৮৭

মাসআলা : উপরোক্ত দুই শ্রেণীর মানুষ ছাড়া(অর্থাৎ দুর্বল বৃদ্ধ ও এমন অসুস্থ ব্যক্তি যারভবিষ্যতে রোযার শক্তি ফিরে পাওয়ারসম্ভাবনা নেই।) আরো যাদের জন্যে রোযাভাঙ্গা জায়েয আছে, (যেমন-মুসাফির, গর্ভবতী ও শিশুকে

স্তন্যদানকারিনী) তারা রোযা না রাখলেরোযার ফিদয়া দিবে না; বরং পরে কাযাকরবে। আর ওযরের হালতে মৃত্যুবরণকরলে কাযা ও ফিদয়া কিছুই ওয়াজিব হবেনা। অবশ্য ওযরের হালত শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ মুসাফির মুকীম হওয়ার পর, গর্ভবতীনারীর সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া ও স্রাব বন্ধহওয়ার পর এবং

স্তন্যদানকারিনী স্তন্যদান বন্ধ করার পর যদিমৃত্যুবরণ করে তাহলে ওযর শেষে যেকয়দিন সময় পেয়েছে সে কয়দিনের কাযাযিম্মায় আসবে। কাযা না করলে উক্তদিনগুলির ফিদয়া প্রদানের অসিয়ত করেযেতে হবে।-আদ্দুররুল মুখতার২/৪২৩-৪২৪; কিতাবুল হুজ্জাহ আলাআহলিল মাদীনাহ ১/২৫৫

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘গর্ভবতী নারী ও শিশুকে

স্তন্যদানকারিনীর জন্যে রমযানে রোযা নারাখার অবকাশ রয়েছে। তারা ফিদয়া আদায়করবে না; বরং রোযাগুলো কাযা করেনিবে।’-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৭০৬৪

মাসআলা : ছুটে যাওয়া রোযার কাযা সম্ভবনা হলে মৃত্যুর পূর্বে ফিদয়া দেওয়ার অসিয়তকরে যাওয়া জরুরি। অসিয়ত না করে গেলেওয়ারিশরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে ফিদয়াদেয় তবে আশা করা যায় যে, আল্লাহতাআলা তা কবুল করবেন। তবে মৃতব্যক্তিঅসিয়ত না করে গেলে সেক্ষেত্রে মিরাসেরইজমালী সম্পদ থেকে ফিদয়া দেওয়া হবেনা। একান্ত দিতে চাইলে বালেগ ওয়ারিশগণতাদের অংশ থেকে দিতে পারবে।-রদ্দুলমুহতার ২/৪২৪-৪২৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া১/২০৭

মাসআলা : এক রোযার ফিদয়া একজনমিসকীনকে দেওয়া উত্তম। তবে একাধিকব্যক্তিকে দিলেও ফিদয়া আদায় হয়ে যাবে।আর একাধিক ফিদয়া এক মিসকীনকেদেওয়া জায়েয।

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘যে বৃদ্ধরোযা রাখতে সক্ষম নন তিনি রোযা না রেখেপ্রতি দিনের পরিবর্তে একজন মিসকীনকেআধা সা’ (অর্থাৎ প্রায় পৌনে দুই কেজি) গমদিয়ে দেবেন।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৭৫৭৪; আলবাহরুর রায়েক ২/৮৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২৭

রোযা মাকরূহ হওয়ার কারণসমূহ

মাসআলা : রোযা অবস্থায় কুলি করার সময়গড়গড়া করা এবং নাকের নরম অংশ পর্যন্তপানি পৌঁছানো মাকরূহ।

লাকিত ইবনে সবিরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামইরশাদ করেছেন-

بالغ في الاستنشاق، إلا أن تكون صائما.

(অযু-গোসলের) সময় ভালোভাবে নাকেপানি দাও, তবে রোযাদার হলে নয়।-জামেতিরমিযী, হাদীস: ৭৬৬; সুনানে আবু দাউদ১/৩২২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস : ৯৮৪৪; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া৩/৩৯৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৯

মাসআলা : এমন কাজ করা মাকরূহ, যারদ্বারা রোযাদার নিতান্তই দুর্বল হয়ে পড়ে।যেমন শিঙ্গা লাগানো।-আলমুহীতুল

বুরহানী ৩/৩৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০০

মাসআলা : রোযা অবস্থায় শরীর থেকে রক্তবের হলে বা ইনজেকশন ইত্যাদি দ্বারা রক্তবের করলে রোযা ভাঙ্গবে না। তবেইচ্ছাকৃতভাবে এ পরিমাণ রক্ত বের করামাকরূহ, যার দ্বারা রোযাদার খুব দুর্বল হয়েযায়।

সাবেত আলবুনানী রাহ. বলেন, আনাস রা. কে জিজ্ঞাসা করা হল রোযার হালতে শিঙ্গালাগানোকে আপনারা কি মাকরূহ মনেকরতেন? তিনি বলেন, ‘না। তবে এ কারণেদুর্বল হয়ে পড়লে তা মাকরূহ হবে।’-সহীহবুখারী, হাদীস ১৯৪০; আলমুহীতুল বুরহানী৩/৩৫৬; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৫

মাসআলা : রোযার হালতে গীবত করলে, গালি-গালাজ করলে, টিভি-সিনেমা ইত্যাদিদেখলে, গান-বাদ্য শ্রবণ করলে এবং যেকোনো বড় ধরনের গুনাহে লিপ্ত হলে রোযামাকরূহ হয়ে যায়। আর এ কাজগুলো যেসর্বাবস্থায় হারাম, তা তো বলাই বাহুল্য।

হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলাইরশাদ করেছেন-

إذا كان يوم صوم أحدكم فلا يرفث ولا يصخب.

‘তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে তখন সেযেন অশ্লীল কথা না বলে এবং শোরগোল, হট্টগোলে লিপ্ত না হয়।-সহীহ বুখারী হাদীস : ১৯০৪;

সুনানে আবু দাউদের রেওয়ায়েতে এ শব্দরয়েছে, ‘রোযাদার যেন কোনো অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত না হয়।’ হাদীস : ৩৩৬৩(১/৩২২)

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবী কারীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদকরেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা-প্রতারণা ওগুনাহের কাজ ত্যাগ করে না আল্লাহতাআলার নিকট তার পানাহার থেকে বিরতথাকার কোনো মূল্য নেই।’-সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৩৬২ (১/৩২২)

যেসব কাজ রোযাদারের জন্য মাকরূহ নয়

মাসআলা : রোযার হালতে প্রয়োজনে জিহবাদ্বারা কোনো কিছুর স্বাদ নেওয়া বা প্রয়োজনেবাচ্চাদের জন্য খাদ্য চিবানো মাকরূহ নয়।তবে সতর্ক থাকতে হবে, যেন স্বাদ গলারভেতরে চলে না যায়।

ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. রোযাদার মহিলাবাচ্চার জন্য খাদ্য চিবানোকে দোষের বিষয়মনে করতেন না।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক৪/২০৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৫৬; রদ্দুলমুহতার ২/৪১৬

মাসআলা : রোযাদারের জন্য সুরমা লাগানোবা সুগন্ধি ব্যবহার করা মাকরূহ নয়।

আতা রাহ. বলেন, ‘রোযাদারের জন্য সুরমাব্যবহার করাতে দোষ নেই।’-মুসান্নাফেআবদুর রাযযাক ৪/২০৮; আলবাহরুররায়েক ২/২৮০

মাসআলা : রোযা অবস্থায়ও মিসওয়াক করাসুন্নত। এমনকি কাঁচা ডাল দ্বারা মিসওয়াককরাও মাকরূহ নয়।

আমির ইবনে রবীয়া রা. বলেন, নবী কারীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমিরোযার হালতে অসংখ্যবার মিসওয়াক করতেদেখেছি।-সহীহ বুখারী ১/২৫৯; মুসান্নাফেআবদুর রাযযাক ৪/২০০

হাসান রাহ.কে রোযা অবস্থায় দিনের শেষেমিসওয়াক করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলেতিনি বলেন, ‘রোযা অবস্থায় দিনের শেষে মিসওয়াক করতে কোনো অসুবিধা নেই।মিসওয়াক পবিত্রতার মাধ্যম। অতএব দিনেরশুরুতে এবং শেষেও মিসওয়াক করো।’-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৪/২০২

ইবরাহীম রাহ. বলেন, ‘রোযা অবস্থায় দিনেরশুরু ও শেষে মিসওয়াক করতে কোনোঅসুবিধা নেই।’-প্রাগুক্ত ৪/২০৩

মুজাহিদ রাহ. রোযা অবস্থায় তাজামিসওয়াক ব্যবহার করাকে দোষণীয় মনেকরতেন না। সুফিয়ান সাওরী রাহ. থেকেওঅনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত আছে।-প্রাগুক্ত৪/২০২; রদ্দুল মুহতার ২/৪১৯; আলবাহরুররায়েক ২/২৮১

শুধু জানা নয়, আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সকল মাসআলা-মাসাইল সমূহের উপর আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন৷

পড়েছেনঃ 41 জন