Rahmania Madrasah Sirajganj

ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানো, -মুফতি আবুল বাশার দা. বা., উস্তাদঃ খুকনী আটারদাগ মাদরাসা

মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানো। পরিবার ও সমাজের জন্য এই গুণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর মধ্যে মাঝেমধ্যে টানাপোড়ন দেখা দেয়, সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। ভাই ভাইয়ের সাথে কথা বলে না, বোন বোনের সাথে কথা বলে না, এক আত্মীয় আরেক আত্মীয়ের সাথে কথা বলে না।

ইসলামি শরীয়ত আমাদেরকে উৎসাহ দেয়, এমনটা হলে আমরা যেন এগিয়ে যাই, সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা নিই। ইসলাম আমাদেরকে এসব ক্ষেত্রে বসে থাকতে বলে না। আমরা যেন উদ্যোগী হই, সে ব্যাপারে ইসলাম আমাদেরকে উৎসাহ দেয়।

আপনি লোকজনকে গিয়ে বলছেন, ‘আমার চাচা আর চাচাতো ভাই কথা বলে না’, ‘আমার ফুফাতো ভাই আর আমার ভাইয়ের মধ্যে সমস্যা, তারা কথা বলে না’। এই বলার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। আপনার দায়িত্ব হলো, কী করলে তারা কথা বলবে সেটা নিশ্চিত করা।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:

“যদি মুমিনদের দুটো দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” [সূরা হুজুরাত ৪৯: ৯]

এখানে ‘দুই দল’ হতে পারে দুটো গোত্র, দুটো দেশ, দুটো জাতি, দুটো পরিবার, এমনকি দুজন ব্যক্তি। যখনই তারা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে, আপনার কাজ না দর্শক হয়ে সেটা উপভোগ করা। আপনার দায়িত্ব হলো তাদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দেয়া।

গোপনে বৈঠক করা সাধারণত খারাপ। তবে, তিনটি ক্ষেত্রে গোপন বৈঠক প্রশংসনীয়। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:

“তাদের গোপন পরামর্শের অধিকাংশে কোনো কল্যাণ নেই। তবে (কল্যাণ আছে), যে নির্দেশ দেয় সদকার, ভালো কাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার। আর যে তা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করবে, তবে অচিরেই আমি তাকে মহাপুরস্কার দান করবো।” [সূরা আন-নিসা ৪:১১৪]

বেশিরভাগ গোপন বৈঠকের খারাপ উদ্দেশ্যে থাকে। তবে, আল্লাহ তিন ধরনের গোপন বৈঠকের প্রশংসা করেছেন; যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানো।

যেমন ধরুন,

আপনার দুজন কাজিন পরস্পর কথা বলে না। আপনি বাকি কাজিনদের সাথে মিলে গোপনে বৈঠক করলেন একটি পিকনিকে যাবেন সবাইকে নিয়ে। পিকনিকে যাবার উদ্দেশ্য হলো ঐ দুই কাজিনের মধ্যে মনোমালিন্য দূর করা। এসব ক্ষেত্রে গোপন বৈঠক প্রশংসনীয়।

মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোড়া লাগানোটাও একটি ইবাদাত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটা নামাজ, রোজা, সাদকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কি তোমাদেরকে নামাজ, রোজা ও সাদকার চেয়ে উত্তম কাজ সম্পর্কে বলবো না?”

সাহাবীরা জানতে চাইলেন, “হ্যাঁ।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“পরস্পর সুসম্পর্ক স্থাপন। কেননা, পরস্পর সুসম্পর্ক নষ্ট হবার অর্থ হলো দ্বীন বিনাশ হওয়া।” [জামে আত-তিরমিজি: ২৫০৯]

এসব আমল নিয়ে যেভাবে কথা বলা দরকার, আমরা সেভাবে বলি না। ফলে, আমরা মনে করি, ইসলাম আমাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করতে বলে, শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ভাবতে বলে। এটা ঠিক না। আপনি অন্যকে নিয়েও ভাববেন, সেটা কল্যাণের উদ্দেশ্যে। অন্যরা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে আপনি মিটিয়ে দিবেন। কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করলে আপনি সেটা জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানান, সেই কাজটি নামাজ-রোজার চেয়েও উত্তম।

আমরা যদি আসলেই সবাইকে ভালোবাসি, তাহলে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ আমরা পছন্দ করবো না। আমরা এগিয়ে যাবো সম্পর্ক জোড়া লাগাতে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে খুতবা দিচ্ছেন। তাঁর আদরের নাতি হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মসজিদে দেখে তিনি তাঁকে কোলে নেন, কোলে নিয়ে খুতবা দেন। তখন তিনি বলেন:

“নিশ্চয়ই আমার এই নাতি নেতা হবে এবং সম্ভবত আল্লাহ তাঁর দ্বারা মুসলমানদের দুটো বড়ো দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করবেন।” [সহীহ বুখারী: ২৭০৪]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়ে দেন যে, হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু নেতা হবেন। আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই, যখন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু খিলাফত দাবি করেন, ঐদিকে ছিলেন হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের দাবি প্রত্যাহার করে নেন। এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যকার আবশ্যিক সংঘাত এড়ানো যায়। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু এজন্যই নেতা যে, তিনি উম্মাহর প্রয়োজনে তাঁর যৌক্তিক দাবি প্রত্যাহার করেন, মুসলিমদের মধ্যকার সন্ধি স্থাপনে, সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজের দাবি থেকে সরে আসেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাতে দেখা যায় তিনি অসংখ্যবার মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক জোড়া লাগান।

একবার তাঁর মেয়ে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘরে গিয়ে দেখেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মেয়ের ওপর রাগ করে বাইরে চলে গেছেন। তিনি মসজিদে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা মনে করেননি যে, ‘এসব তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, তোমরাই ঠিক করো’। তিনি বরং মসজিদে যান, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য তাঁকে সুন্দর একটি নামে ডাকেন ‘হে আবু তুরাব’। [সহীহ বুখারী: ৪৪১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতে পান মদীনার অলিতে গলিতে এক যুবক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। যেই তাঁকে এভাবে দেখছে তার মায়া লাগছে। মদীনার সমাজ, যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আছেন, সেই সমাজের একজন লোক একজন মেয়ের জন্য কেঁদে বেড়াচ্ছেন!

তাঁর নাম মুগীস। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী এবং একজন দাস। বারীরা নামের এক মেয়ের পিছু পিছু তিনি ঘুরছেন। বারীরা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তারা দুজনই দাস-দাসী ছিলেন। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হবার পর তাদের বিয়েটি বহাল রাখবেন কিনা সেটা তাদের এখতিয়ার। মুগীস বিয়ে বহাল রাখতে চাইলেন, কিন্তু বারীরা চাইলেন না।

বারীরা মুগীসকে তালাক দিয়ে সে চলে গেলেন। কিন্তু, বারীরার চলে যাওয়া মুগীস মেনে নিতে পারেননি। বাচ্চা ছেলেদের মতো বারীরা পিছু পিছু ঘুরছেন। কান্না করতে করতে তাঁর দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেছে।

মুগীসকে এই অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও মায়া হলো। মুগীসের আবেগটি তিনি অনুভব করলেন। তাঁর সাথে থাকা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন, “ও আব্বাস! বারীরার প্রতি মুগীসের ভালোবাসা এবং মুগীসের প্রতি বারীরার অনাসক্তি দেখে তুমি কি আশ্চর্যান্বিত হওনা?”

মুগীসের কান্না দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পক্ষ নিয়ে বারীরার কাছে গেলেন। বারীরাকে গিয়ে বললেন, “তুমি যদি তাঁর কাছে আবার ফিরে যেতে!”

বারীরা ছিলেন বেশ বুদ্ধিমতী। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আমাকে আদেশ দিচ্ছেন?”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথাটি পরিস্কার করেন। “না, আমি কেবল সুপারিশ করছি।”

বারীরা যখন বুঝলেন এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ না, তিনি চাইলে নিজের মতের ওপর চলতে পারেন তখন বললেন, “আমি তাঁকে (মুগীসকে) চাই না।” [সহীহ বুখারী: ৫২৮৩]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবিক জায়গা থেকে তাঁদেরকে মিলিয়ে দিতে আসলেন, মুগীসের পক্ষ হয়ে বারীরার কাছে সুপারিশ করলেন। কিন্তু, বারীরা সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর জোরাজুরি করেননি।

সাধারণত মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ।

কিন্তু, যেসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলাকে ইসলাম সমর্থন করে, তারমধ্যে একটি হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানো। দুজনের মধ্যে যদি সম্পর্কের টানাপোড়ন দেখা দেয়, কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তাদেরকে এক করে দিতে আপনি মিথ্যা বলতে পারেন।

যেমন: দুজন মানুষের মধ্যে যদি মন কষাকষি হয়, তাদেরকে একত্র করতে প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে পারেন। যেমন: একজনকে বলতে পারেন, অমুক তো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে অনুতপ্ত, সে আমাকে বললো তোমার সাথে কথা বলতে চায়। আবার, অন্যজনকে গিয়ে বলুন, অমুক সেদিন যেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটার জন্য পরে কষ্ট পেয়েছে। সে চাচ্ছে তোমার সাথে কথা বলতে। আসো, তার সাথে গিয়ে কথা বলি।

এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলতে কোনো অসুবিধা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে লোকের মধ্যে আপোষ সমাধা করে দেয়। সে কল্যাণের জন্যই মিথ্যা বলে এবং কল্যাণের জন্যই চোখলখোরী করে।” [সহীহ মুসলিম: ৬৫২৭]

মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে মিথ্যা বলা পর্যন্ত অনুমোদিত। এ থেকে বুঝা যায় সম্পর্ক জোড়া লাগানো ইসলামে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ।

এজন্য একজন আলেম বলেন:

“সত্য বলে সম্পর্ক ছিন্ন করা আল্লাহ অপছন্দ করেন। কিন্তু, মিথ্যা বলে সম্পর্ক জোড়া লাগানো আল্লাহ পছন্দ করেন।”

সমাজে যদি এই আখলাক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অসংখ্য সম্পর্ক জোড়া লেগে যাবে। মানুষের মধ্যে মনোমালিন্য হলে সেটা মিটে যাবে। কারণ, অন্যরা উদ্যোগ নিবে।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:

“মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও।” [সূরা হুজুরাত ৪৯: ১০]

আল্লাহ্ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট অক্ষুণ্ণ রাখুন । আমীন।

পড়েছেনঃ 40 জন