Rahmania Madrasah Sirajganj

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম সম্বন্ধে কুরআন ও হাদিস কি বলে?

ভুমিকা৷
বাসমালাহ কি?
বাসমালাহ‘র তাফসীর৷
বাসমালাহ‘র গুরত্ব৷
বাসমালাহ‘র ফজিলত৷
বাসমালাহ‘র উপকারিতা৷
বাসমালাহ’র বিস্ময়কর প্রভাব৷
বাসমালাহ’র মর্যাদা রক্ষা৷
উপসংহার৷

ভুমিকা:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম একটি আরবী বাক্যবন্ধ, যার অর্থ পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সংক্ষেপে বলা হয় বিসমিল্লাহ্‌। পবিত্র কুরআন শরীফের ১১৪টি সূরার মধ্যে সূরা তওবা ব্যতিদরেকে বাকি ১১৩টি সূরা শুরু করা হয়েছে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” দিয়ে।

এছাড়া হাদীস থেকে জানা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” বলে শুরু করতেন।

এ জন্য আল্লাহর নাম অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলেই সব কাজ শুরু করা উচিত। আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তার অনুগ্রহ-অনুকম্পা পেয়েই আমরা বেঁচে আছি। আর এই অনুগ্রহ-অনুকম্পা লাভের জন্য তিনি দিয়েছেন একটি বাণী, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম’।

বিসমিল্লাহ কি?
পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহ সুবহানাওয়াতায়ালার। দরুদ ও সালাম আল্লহর প্রেরিত রসূল (সাঃ) এর প্রতি।

তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত ওসমান বিন আফফান (রাঃ) রাসূল (সাঃ) কে ‘বিসমিল্লাহ’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ ‘এতো আল্লাহতায়ালার নাম। আল্লাহর বড় নাম এবং এই বিসমিল্লাহ এর মধ্যে এতদূর নৈকট্য রয়েছে যেমন রয়েছে চক্ষুর কালো অংশ ও সাদা অংশের মধ্যে।’

ইবনে মরদুওয়াই এর তাফসিরে রয়েছে যে; রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘আমার উপর এমন একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যার মত আয়াত হযরত সোলাইমান ছাড়া অন্য কোন নবীর উপর অবতীর্ণ হয় নাই। আয়াতটি হল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”।’

হযরত জাবির (রাঃ) বর্নণা করেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন পূর্ব দিকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, বায়ুমন্ডলী স্তব্ধ হয়ে যায়, তরঙ্গ বিক্ষুব্দ সমুদ্র প্রশান্ত হয়ে উঠে, জন্তু গুলো কান লাগিয়ে মনযোগ সহকারে শুনতে থাকে, আকাশ থেকে অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়ে শয়তানকে বিতারন করে এবং বিশ্ব প্রভু স্বীয় সন্মান ও মর্যাদার কছম করে বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপর আমার এ নাম নেওয়া যাবে তাতে অবশ্যই বরকত হবে।’

মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূল (সাঃ) এর সোয়ারীর উপর তাঁর পিছনে যে সাহাবী (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন তাঁর বর্ণনাটি এইঃ ‘রাসুল (সাঃ) এর উষ্ট্রীটির কিছু পদস্খলন ঘটলে (হোঁচট খেলে) আমি বললাম যে শয়তানের সর্বনাশ হোক। তখন তিনি বললেন, এরূপ বলোনা, এতে শয়তান গর্বভরে ফুলে উঠে এবং মনে করে যে, যেন সে-ই স্বীয় শক্তির বলে ফেলে দিয়েছে। তবে হাঁ ‘বিসমিল্লাহ’ বলাতে সে মাছির মত লাঞ্ছিত ও হৃতগর্ব হয়ে পরে।’ ইমাম-নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব ‘আমালুল ইয়াওমে ওয়াল লাইলাহ’ এর মধ্যে এবং ইবনে মরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং সাহাবীর নাম বলেছেন ওসামা-বিন-ওমায়ের (রাঃ)।

হাদীসে আছে যে ‘বিসমিল্লাহ’ এর দ্বারা কাজ আরম্ভ করা না হয় তা কল্যাণহীন ও বরকত শূন্য থাকে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এর অর্থঃ- ‘পরম করুনাময় ও অসীম মেহেরবান আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।’

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম‘র তাফসীর:

বিসমিল্লাহ রহমানির রহিম কয়েকটি শব্দ দ্বারা গঠিত।
প্রথমতঃ ‘বা’ বর্ণ
দ্বিতীয়তঃ’ইসম’ বর্ন এবং
তৃতীয়তঃ’আল্লাহ’

(১) ‘বা’ বর্ণ
আরবী ভাষায় ‘বা’ বর্ণটি অনেক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তন্মধ্যে তিনটি অর্থ এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। এবং এই তিনটির মধ্যে যেকোন একটি অর্থ এ ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যেতে পারে।

ক. সংযোজন, অর্থাৎ এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে মিলানো বা সংযোজন ঘটানো।
খ. এস্তেয়ানাত, অর্থাৎ কোন বস্তুর সাহায্য নেয়া।
গ. কোন বস্তু থেকে বরকত হাসিল করা।

(২) ‘ইসম’ বর্ণ
‘ইসম’ শব্দের ব্যাখ্যা অত্যন্ত ব্যাপক। মোটামটিভাবে এতটুকু যেনে রাখা যথেষ্ট যে, ‘ইসম’ নামকে (Noun)বলা হয়। অর্থাৎ নামের সাথে বোঝানো হলে ‘ইসম’ ব্যবহার করা হয়

(৩) ‘আল্লাহ’ শব্দ
‘আল্লাহ’ শব্দ সৃষ্টিকর্তার নামসমুহের মধ্যে সবচেয়ে মহত্ত্বর ও তার যাবতীয় গুণাবলীর সম্মিলিত রুপ। কোন কোন আলেম একে ইসমে আ’যম বলেও অভিহিত করেছেন। এই নামটি আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো জন্য প্রযোজ্য নয়। এজন্যই এই শব্দটির দ্বিবচন বা বহুবচন হয় না। কেননা আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। মোটকথা, আল্লাহ এমন এক সত্ত্বার নাম, যে সত্ত্বা পালনকর্তার সমস্ত গুনাবলীর এক অসাধারণ প্রকাশবাচক। তিনি অদ্বিতীয় ও নজীরবিহীন।

সর্বোপরি, বিসমিল্লাহ শব্দের মধ্যে ‘বা’-এর তিনটি অর্থের সামঞ্জস্য করলে এর তিনটি অর্থ দাঁড়াতে পারে-
এক. আল্লাহর নামের সাথে
দুই. আল্লাহর নামের সাহায্যে
তিন. আল্লাহ নামের বরকতে
কুরআন তেলওয়াত ও প্রত্যেক কাজ বিসমিল্লাহ’সহ আরম্ভ করার আদেশ
জাহেলিয়াত যুগে লোকদের অভ্যাস ছিল, তারা তাদের প্রত্যেক কাজ উপাস্য দেব-দেবীদের নামে শুরু করত। এ প্রথা রহিত করার জন্য হযরত জীব্রাইল (আঃ) পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম যে আয়াত নিয়ে এসেছিলেন, তাতে আল্লাহর নামে কোরআন তেলওয়াত আরম্ভ করার আদেশ দেয়া হয়েছে (পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে)।

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, স্বয়ং রাসূলে করিম (সাঃ)-ও প্রথমে প্রত্যেক কাজ “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” বলে আরম্ভ করতেন এবং কোন কিছু লেখাতে হলেও এ কথা প্রথমে লেখাতেন। কিন্তু “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” অবতীর্ণ হওয়ার পর সর্বকালের জন্য ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ বলে সব কাজ শুরু করার নিয়ম প্রবর্তিত হয়েছে।
-(কুরতুবি,রূহূল মা’আনী)

কোরআনুল কারীমের স্থানে স্থানে উপদেশ হয়েছে যে, প্রত্যেক কাজ “বিসমিল্লাহ” বলে আরম্ভ কর। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে কাজ বিসমিল্লাহ ব্যতিত আরম্ভ করা হয় না, তাতে কোন বরকত থাকে না।”

এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে যে, ঘরের দরজা বন্ধ করতে বিসমিল্লাহ বলবে, বাতু নেভাতে বিসমিল্লাহ বলবে, পাত্র আবৃত করতেও বিসমিল্লাহ বলবে। কোন কিছু খেতে, পানি অয়ান করতে, অজু করতে, সওয়ারীতে আরোহন করতে এবং তা থেকে অবতরনকালেও বিসমল্লাহ বলার নির্দেশ কোরআন-হাদিসে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে।
-(কুরতুবি)

রহমান ও রহীম
﴿ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ﴾
‘‘পরম করুণাময় অতি দয়ালু।’’

রহমত থেকে উদ্ভুত গুণবাচক দু’টি নাম। তন্মধ্যে একটি অপরটির চেয়ে অধিকতর অর্থবহ। যেমন, সর্বজ্ঞ ও অতি জ্ঞানী। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, এ গুণবাচক নাম দু’টি অতি সূক্ষ্ম, তন্মধ্যে একটি অপরটির চেয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম অর্থাৎ অধিক রহমত সম্পন্ন।

ইবনুল মোবারাক বলেন, ‘রহমান’ তাঁকেই বলে যাঁর কাছে চাইলে তিনি দান করেন, আর ‘রাহিম’ তাঁকে বলে যাঁর কাছে না চাইলে তিনি রাগ্বান্বিত হন। জামে’উত তিরমিযীতে আছে যে, আল্লাহতায়ালার নিকট যে ব্যাক্তি চায় না তিনি তার প্রতি রাগ্বান্বিত হন।

রুহল বয়ান ও তাফসীরে কাবীরে বিশ্লেষন করা হয়েছে যে, রাহমান হচ্ছেন তিনিই যিনি কোন মাধ্যম ব্যতিরেকে রহম বা দয়া প্রদর্শন করেন। আর রাহীম হচ্ছেন তিনি যিনি কোন মাধ্যম দ্বারা বান্দাদেরকে করুণা করেন। হযরত যুননুন মিশরী (র) বলেন- একদিন আমি নীল নদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রতি মধ্যে দেখলাম যে, একটি বিচ্ছু দ্রুত নদীর দিকে এগুচ্ছে। বিচ্ছুটি যখন নীল নদের ধারে পৌছালো হঠাৎ একটি কচ্ছপ নদীর ধারে আসল। বিচ্ছুটি এর উপর সওয়ার হল আর কচ্ছপ একে বহন করে নদীর এপার থেকে ওপারে নিয়ে গেল। আমার এ বিষয়টি জানার জন্য আগ্রহ জাগল যে, আমি দেখব, এ কচ্ছপটি বিচ্ছুটিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। অত:পর আমি নৌকা দিয়ে কচ্ছপকে অনুস্বরণ করতে লাগলাম। দেখলাম যে, বিচ্ছুটি যখন ওপারে গিয়ে পৌছল তখন কচ্ছপ লেকে নেমে গিয়ে সামনের দিকে দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। আমিও তার অনুস্বরণ করতে লাগলাম। কিছু দুর গিয়ে দেখলাম একটা যুবক ঘুমাচ্ছে এবং তারপাশে একটা বিশধর সাপ। যুবকটিকে সাপে দংশন করতে চাচ্ছিল। এমতাবস্থায় বিচ্ছুটি সাপটিকে আক্রমন করল আর সাপও বিচ্ছুটিকে পাল্টা আক্রমন করল। তারপর উভয়ই পরস্পরের আক্রমন ও দংশনের বিষে মারা গেল। কিন্তু যুবকটি বেঁচে গেল। আর এটাই হল ‘রাহীম’ নামের গুণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এভাবেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কোনো না কোনো মাধ্যমে সাহায্য করে থাকেন।

কেউ কেউ বলেন ‘‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর মধ্যে যে ‘আল্লাহ’ শব্দ আছে, এটাই হল ইসমে আজম।

হযরত সুলাইমান (আ) যখন বিলকিছকে প্রথম চিটি লিখেছিলেন, সেখানে তিনি লিখেছিলেন-

اِنّهُ مِن سُليمان و اِنّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم ٠

(সূরা নমল:আয়াত-৩০)

কাজেই এই বিসমিল্লাহর বরকতে বিলকিছ সুলাইমান (আ) এর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন এবং বিলকিছের পুরা ইয়ামান রাজ্য হযরত সুলাইমান (আ) এর আয়ত্বে এসেছিল।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম‘র গুরত্ব:
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” কোরআন শরীফের সূরা নামলের একটি আয়াত বা অংশ। সূরা তাওবা ব্যতীত প্রত্যেক সূরার প্রথমে এই আয়াত লেখা হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (র) বলেন- ‘এটা এমন একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ আয়াত যা প্রত্যেক সূরার প্রথমে লেখা এবং দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।’ কোরআন শরীফের স্থানে স্থানে উপদেশ রয়েছে যে, প্রত্যেক কাজ “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” বলে আরম্ভ কর। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘যে কাজ “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” ব্যতীত আরম্ভ করা হয়, তাতে কোন বরকত থাকে না।’ এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ঘরের দরজা বন্ধ করতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” বলবে, বাতি নেভাতেও “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” বলবে, পাত্র আবৃত করতেও “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” বলবে। কোনো কিছু খেতে, পানি পান করতে, ওযু করতে, সওয়ারীতে আরোহণ করতে এবং তা থেকে অবতরণকালেও “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” বলার নির্দেশ কোরআন-হাদিসে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। (তাফসীরে কুরতুবী)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম‘র ফজিলত:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আল্লাহ্ তায়ালার সর্ব শেষ গ্রন্থ কোরআনে কারীমের হীরক খন্ড, যা কারো দিলে একবার বসে গেলে সেখানেই ঘর বানিয়ে নেয়। বিসমিল্লার আমল যার দিলে থাকবে তাকে যে সম্মান, শান্তি, বরকত ও মহত্ব দান করা হয় অন্য কোনো আমলের দ্বারা তা সম্ভব নয়। বিসমিল্লার ‘বা’ এর নুকতার বরকতে আল্লাহ্ তায়ালার যে রহমতের ঝর্না ধারা প্রবাহিত হয়, সমস্ত মাখলুক সেই রহমত থেকে উপকৃত হতে থাকে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) থেকে এরশাদ ফরমান – যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহির রাহমানি রাহীম পাঠ করবে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে প্রত্যেক হরফের পরিবর্তে চার হাজার নেকি দান করবেন, চার হাজার গুনাহ মাফ করে দিবেন, এবং চার হাজার সস্মান বৃদ্ধি করে দিবেন।
(নুজহাতুল মাজালিশ)

বিসমিল্লার মধ্যে ১৯টি হরফ আছে, এই ১৯টি হরফ একবার পাঠ করবার কারনে ৭৬ হাজার নেকি দান করা হবে, ৭৬ হাজার গুনাহ্ মাফ করা হবে, এবং ৭৬ হাজার সম্মান বৃদ্ধি করা হবে।সুবহানাল্লাহ্ আল্লাহ্ রব্বে কারীম কত বড় দেনেওয়ালা তা মানুষের কল্পনাতীত অতুলনীয়।

যখন বিসমিল্লাহ্ শরীফ নাযিল হয় তখন শয়তান লজ্জায় মাথায় মাটি মাখে এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করে বেইজ্জত করা হয়। অতঃপর আল্লাহ্ রাব্বুলআলামিন স্বীয় ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম করে বলেন – যে কাজের মধ্যেই আমার বান্দা আমার এই বরকতপুর্ন নাম নিবে সে কাজের মধ্যে আমি বিপুল বরকত দান করবো। কোন রোগী যদি পাঠ করে তবে আমি পূর্ন আরোগ্য দান করবো। অবশেষে পাঠ কারীকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো।

হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আদম সন্তান যখন কাপড় খোলে, তখন তার সতর ও নিজদের চোখের মধ্যবর্তী পর্দা হচ্ছেবিসমিল্লাহির-রাহমানির রাহিম`। তাহলে আল্লাহ ইচ্ছা করলে বিসমিল্লাহর আমলকারীদের জন্য জাহান্নামকেও আড়াল করে দিতে পারেন।

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে এরশাদ করেন, ‘হে আবু হুরায়রা! তুমি যখন অজু করবে, বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে ফেরেশতাগণ তোমার অজু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার জন্য পুণ্য লিখতে থাকবে। তুমি যখন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবে, তখন বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে যতক্ষণ না তুমি গোসল শেষ করবে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তোমার জন্য পুণ্য লিখতে থাকবে। সেই সহবাসে যদি তোমার কোনো সন্তান লাভ হয়, তবে সেই সন্তানের নিঃশ্বাস এবং তার যদি বংশধারা চালু থাকে, তবে যতকাল তা চালু থাকবে, ততকাল পর্যন্ত তাদের সবার নিঃশ্বাসের সংখ্যা পরিমাণ পুণ্য তোমার আমলনামায় লেখা হতে থাকবে। হে আবু হুরায়রা! তুমি যখন পশুর পিঠে চড়বে, তখন বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে তার প্রতি কদমে তোমার জন্য পুণ্য লেখা হবে। আর যখন নৌকায় চড়বে, তখনো বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে যতক্ষণ না তুমি তা থেকে নামবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার জন্য পুণ্য লেখা হতে থাকবে।`

বিসমিল্লাহ এর বরকত সর্ম্পকে একটি ঘটনা শুনে নেওয়া যাক।

রোম সম্রাট একবার খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে তার মাথা ব্যথার কথা জানিয়ে প্রতিকারের জন্য আবেদন করেছিল। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে একটি টুপি প্রেরণ করেছিলেন। যতক্ষণ এ টুপি মাথায় থাকতো ততক্ষণ মাথা ব্যথা হতো না। কিন্তু যখনই মাথা থেকে টুপি সরানো হতো, সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা শুরু হতো। এ ঘটনায় সবাই বিস্মিত হয়। অবশেষে টুপি খুলে এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেল যে তাতে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহ লেখা আছে এমন কোনো কাগজের টুকরা আল্লাহ তায়ালার তাজিমের উদ্দেশ্যে হেফাজত করেন, আল্লাহর কাছে তার নাম সিদ্দিকদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তার পিতামাতার শাস্তি লাঘব করা হয়, যদিও তারা মুশরিক হয়ে থাকে।’

হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, বিসমিল্লাহ যখন নাজিল হয়, তখন মেঘমালা পূর্বদিকে দৌড়াতে লাগল, সাগরগুলো উত্তাল অবস্থায় ছিল, সব প্রাণীজগত নিস্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে শুনতে ছিল, শয়তানকে দূরে বিতাড়িত করা হয়েছিল এবং আল্লাহ তাআলা নিজ ইজ্জত ও জালালিয়াতের কসম খেয়ে বলেছেন, যে জিনিসের ওপর বিসমিল্লাহ পড়া হবে, ঐ জিনেসে অবশ্যই বরকত দান করব। (তাফসিরে মারদুওয়াই)

হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিপক্ষে শত্রু যুদ্ধের ময়দানে অপেক্ষা করছিল। হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদের ধর্মে সত্যতা পরীক্ষার জন্য বিষে ভরা একটি শিশি তাঁকে দেয়া হলো। তিনি শিশির সম্পূর্ণ বিষ বিসমিল্লাহ পড়ে পান করেছেন। কিন্তু বিসমিল্লাহ`র বরকতে বিষের বিন্দু মাত্র প্রভাবও তার ওপর পড়েনি। (তাফসিরে কাবির)

হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, কোনো ব্যক্তি যদি পায়খানায় প্রবেশকালে বিসমিল্লাহ পড়ে, তবে জিন ও শয়তানদের দৃষ্টি ঐ ব্যক্তির গুপ্তাঙ্গ পর্যন্ত পৌছতে পারে না। (তিরমিজি)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে খাদ্যে বিসমিল্লাহ পড়া হয় না, সে খাদ্যে শয়তানের অংশ থাকে। (মুসলিম)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে খাবারের মজলিসে জনৈক সাহাবি বিসমিল্লাহ ব্যতিত খাওয়া শুরু করে। পরে যখন স্মরণ হয় তখন বলেন, বিসমিল্লাহি আওয়ালিহি ও আখিরিহি` তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ অবস্থা দেখে হাসতে লাগলেন এবং বললেন, শয়তান যা কিছু খেয়েছিল তিনি (সাহাবি) বিসমিল্লাহ পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে সব বমি করে দিয়েছে। (আবু দাউদ)

রাসুল (সা) এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম তিলাওয়াত করে, আল্লাহপাক তাঁর জন্য দশ হাজার নেকি লিখেন এবং দশ হাজার বদী মার্জনা করেন এবং দশ হাজার উচ্চ মর্যাদা দান করেন।” অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি একবার “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ করে, তাঁর সমস্ত গোনাহের মধ্যে এক বিন্দু গোনাহও বাকি থাকে না। মোহাদ্দিগণ উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- এই হাদিসে যে গোনাহের কথা উল্লেখিত হয়েছে তা হল ছগিরা গোনাহ।

হাদিস শরীফে আরো বর্ণিত আছে, যে সময় কোনো ব্যক্তি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ করে তখন শয়তান এমনভাবে গলে যায় যেভাবে সীসা গলে যায়।

রূহুল বয়ানের তাফসীরকারক স্বীয় তাফসীরে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর আলোচনায় একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন- যখন হুযুর আলাইহিস সালাম মি‘রাজে তাশরীফ নিলেন এবং জান্নাতসমূহে ভ্রমণ করলেন তখন চারটি নহর (প্রস্রবন) বা প্রবাহমান নদী পরিদর্শন করেন । এগুলো হলো-
১. পানির প্রস্রবণ।
২. দুধের প্রস্রবণ
৩. শরাব বা পানীয় এর প্রস্রবণ
৪. মধুর প্রস্রবণ
হুযুর আলাইহিস সালাম জিব্রাঈল আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, এ নদীগুলো বা প্রস্রবণগুলো কোথা থেকে এসেছে? হযরত জিব্রাঈল (আ) আরয করলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আমি এ সম্পর্কে অবহিত নই। অন্য আরেকজন ফেরেস্তা এসে আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! এ চারটি প্রস্রবণ আমি দেখাচ্ছি। তিনি হুযুর আলাইহিস সালামকে একটি স্থানে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি বৃক্ষ ছিল যার নিচে একটি দালান তৈরি হয়েছিল। এবং দরজার ওপর তালা ঝুলছিল এবং এই দালানের নিচ থেকে এ চারটি নহর প্রবাহিত হচ্ছিল। হুযূর আলাইহিস সালাম এরশাদ করলেন- দরজা খুলো। ফেরেস্তা আরয করলেন, এর চাবি আমার কাছে নেই; বরং আপনারই কাছে রয়েছে। এই দালান খোঁলার চাবি হল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”। হুযূর আলাইহিস সালাম “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে তালায় হাত স্পর্শ করলেন, দরজা খুঁলে গেল। তিনি ভেতরে গিয়ে পরিদর্শন করে দেখলেন যে, সেই দালানে চারটি খুঁটি রয়েছে। আর প্রতিটি খুঁটিতে লেখা রয়েছে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”। بِسْمِ اللَّه এর م থেকে পানি প্রবাহিত হচ্ছে এবং اللَّه ইসিমের ه থেকে দুধ বের হচ্ছে। الرَّحْمَن এর م থেকে শরাব এবং الرَّحِيم শব্দের م থেকে মধু রেব হচ্ছে। ভেতর থেকে শব্দ আসছে- হে আমার মাহবুব! আপনার উম্মতের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়বে, সে এই চারটি নি‘য়ামতের হকদার হবে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর মধ্যে মোট ১৯টি হরফ। আর দোজখ রক্ষাকারী সরদার ফেরেস্তাও ১৯ জন। যে ব্যক্তি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ করে, সে উক্ত সরদার ফেরেস্তাদের সব রকম আজাব হতে মুক্তি লাভ করবে।

হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, দোজখের দারোগা ফেরেস্তার নাম মালেক। তিনি যখন কোনো ফেরেস্তাকে দোজখের বিভিন্ন প্রকোষ্টের মধ্যে কোনো ব্যক্তির নতুন কোনো আজাবের ব্যবস্থা করার জন্য পাঠাবেন, তখন মালেক ফেরেস্তা উক্ত ফেরেস্তার কপালে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখে দিবেন। তখন দোজখের আগুন ঐ ফেরেস্তার দেহে কোনো ক্রিয়া বা ক্ষতি করবে না। অর্থাৎ দোজখের আগুন ঐ ফেরেস্তার গায়ে লাগবে না ।

দুররুল মুখতার এ বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তির মৃত্যূর পর তাঁর কপালে ও বুকে (আঙ্গুল দ্বারা ইঙ্গিতে) “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখে দেয়া হলে এর বরকতে তিনি কবরের আযাব হতে রেহাই পেয়েছিলেন।

তাফসীরে আযীযীর মধ্যে বর্ণিত আছে, এক ওলী আল্লাহ তাঁর কাফনে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখে দেয়ার ওসিয়ত করলে তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হয়। উত্তরে তিনি বলেন যে, শেষ বিচারের দিন তিনি করুনাময় আল্লাহর দরবারে তাঁর রাহমান ও রাহিম নামের যথার্থ মূল্য দাবি করতে পারবেন।

তাফসীরে কাবীর শরীফের মধ্যে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর আলোচনায় তাফসীরকারক লিখেছেন-ফেরআউন তাঁর খোদায়িত্বের দাবীতে প্রথমে একটি ঘর বানিয়েছিল। আর এই ঘরের বহির্দরজায় লিখেছিল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”। যখন সে খোদায়িত্ব দাবী করল এবং মুসা আলাইহিস সালাম তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন আর সে কবুল করল না। তখন মুসা (আ) তার ওপর বদ্ দোয়া করলেন। ওহী আসল, হে মুসা! এটাই ফায়সালা যে, তাকে ধ্বংস করে দেয়া হবে; কিন্তু তাঁর দরজায় (বিসমিল্লাহ) লেখা রয়েছে, যার কারণে সে বেঁচে গেল। এ জন্যই ফেরাউনের ঘরে আযাব আসল না; বরং সেখান থেকে বের করে সাগরে ডুবিয়ে দেয়া হল। একজন কাফিরের ঘর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর ওসীলায় বেঁচে গেল। সুতরাং যদি কোন মুসলমান স্বীয় অন্তরে ও মুখে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে নেয় তাহলে কেন সে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচবে না? অবশ্যই রক্ষা পাবে।

ওলামায়ে কেরামদের অভিমত হল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর মধ্যে ইসমে আজম এতোই নিকটবর্তী যে, যেমন চোখের কালো ও সাদা অংশের মধ্যে দুরত্ব। বিসমিল্লাহ শরীফের ফজিলত

শামছুল মুয়ারিফুল কোবরায় আছে, হযরত আকরামা (রা) থেকে বর্ণিত যে, সর্ব প্রথম আল্লাহ তা’য়ালা একা ছিলেন। কোন কিছুই তখন ছিল না। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। তখন আল্লাহ তা’য়ালা সর্ব প্রথম নূর সৃষ্টি করলেন। তারপর লৌহ ও কলম সৃষ্টি করলেন এবং কলমকে হুকুম করলেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লৌহের মধ্যে লিপিবদ্ধ কর। কলম লৌহের মধ্যে শুরুতেই লিখেছিল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” আদম (সা) এর উপর প্রথম নাজিল হয়। আদম সৃষ্টির সময় তাঁর পেশানীর উপর লিখা হয় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”। আদম (আ) এর ওফাতের পরই “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” আয়াতকে আসমানে তুলে নেয়া হয়। যখন হযরত ইব্রাহিম (আ) নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হন, তখন আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আ) ইব্রাহিম (আ) এর উপর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” নাজিল করেন এবং নমরুদের অগ্নিকুন্ড ইব্রাহিম (আ) এর জন্য শান্তিদায়ক ঠান্ডায় পরিণত হয় এবং ফুলের বাগান তৈরি হয়। ইব্রাহিম (আ) এর ইন্তিকালের পর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” আয়াতটিকে আবারো আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” হযরত সোলেমান (আ) এর উপর নাজিল হয়। সোলেমান (আ) এর আংটির মধ্যে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখা ছিল। তার ইন্তিকালের পর আবার এটাকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” হযরত মুসা (আ) এর উপর নাজিল হয় এবং মুসা (আ) এর লাঠির মধ্যে ছুরইয়ানী ভাষার “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখাছিল। তার ইন্তিকালের পর এটা আবারো আসমানে চলে যায়। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” হযরত ঈসা (আ) এর উপর নাজিল হয়। এমন কি হযরত ঈসা (আঃ) এর জিহবার মধ্যে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখিত ছিল। যে কারণে তিনি জন্মের পরই কথা বলেছিলেন। অবশেষ মহানবী (সাঃ) এর উপর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” নাজিল হয় এবং আল্লাহ তা’য়ালা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” কে কিয়ামত পযর্ন্ত দায়িম ও কায়িম রাখেন। এজন্য কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগ পযর্ন্ত আমরা “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” আয়াত হতে ফায়েদা হাসিল করতে থাকব।

একটি চমংকার ঘটনা
তাফসীরে কাবীর শরীফের তাফসীরকারক “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর আলোচনায় একটি চমংকার ঘটনা লিপিবিদ্ধ করেছেন যে, একজন ভিক্ষুক একজন বড় সম্পদশালী ব্যক্তির দ্বারপ্রান্তে আসল এবং কিছু চেয়ে বসল আর সেই আলীশান দরবার থেকে সামান্য কিছু জিনিস পেল। ফকীর তা নিল এবং চলে গেল। দ্বিতীয় দিন সেই ফকীর একটি খুব শক্ত কোদাল নিয়ে আবার আসল এবং দরজা কুঁড়তে লাগল। মালিক বললেন, তুমি একি কাজ করছ? ফকীর বলল, হয়তো দান-খয়রাতকে দরজার সমমর্যাদাপূর্ণ উপযুক্ত করুন, না হলে দরজাকে দান-খয়রাতের সমমানের করুন। অর্থাৎ দরজা যেহেতু এত বড় বানিয়েছেন সুতরাং এর উপযুক্ত মর্যাদা হল বড় দরজা থেকে বড় ভিক্ষাই বের হবে। কেননা, দান-খয়রাত ইত্যাদি দরজা ও নামের উপযুক্ত হওয়া চাই। আমরাও আল্লাহর দরবারে আরয করি যে, হে মাওলা! আমাদেরকে আমাদের ফকীরের মর্যাদা অনুযায়ী দিওনা; বরং আপনার দান বখশিশের মর্যাদা অনুযায়ী দিও। নিঃসন্দেহে আমরা পাপী কিন্তু আপনার ক্ষমাশীলতা আমাদের পাপীত্বের চেয়েও বড়

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম‘র উপকারিতা:
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর অসংখ্য উপকারীতা রয়েছে। তাফসীরে কাবীর ও তাফসীরে আযীযী থেকে এখানে কতিপয় উপকারীতার বর্ণনা করছি-

যে ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীর পাশে যাওয়ার সময় অর্থাৎ সহবাসের পূর্বে ‘‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়বে তাতে শয়তান শরীক হবে না। এবং সেই সঙ্গমে যদি মায়ের গর্ভে সন্তান ধারণ নিশ্চিত হয়ে যায় তাহলে জরায়ুতে সেই ধারণকৃত বাচ্চার জীবনে যে পরিমাণ শ্বাস নিবে সেই পরিমাণ সওয়াব ও কল্যান তার পিতার আমল নামায় লিপিবদ্ধ হবে।বিসমিল্লাহ শরীফের ফজিলত

যে ব্যক্তি কোনো প্রাণীর উপর আরোহণ করার সময় বিসমিল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ পড়ে নিবে তাহলে সেই প্রাণীর প্রতিটি কদমের জন্য সেই আরোহীর অনুকূলে একটি সওয়াব বা কল্যান লিপিবদ্ধ হতে থাকবে।

যে ব্যক্তি কোনো নৌ-যানে আরোহণ করার সময় বিসমিল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ পড়ে নিবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে সেই আরোহণে বর্তমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য পূণ্য ও কল্যান লিপিবদ্ধ হবে।

যে রোগী ‘‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে ঔষধ সেবন করবে ইনশা আল্লাহ তার উপকার হবে।

একটি হেকায়েত

একবার হযরত মূসা (আ) এর পেটে খুব ব্যথা হল। মহান আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, হে আল্লাহ! আমার ব্যথা কমিয়ে দিন। এরশাদ হল, অরণ্যের অমুক দানা খাও। সুতরাং তিনি সেই দানা খেলেন এবং সাথে সাথে রোগ আরোগ্য হয়ে গেল। কিছুদিন পরে তিনি সেই রোগে আবার আক্রান্ত হলেন। মুসা (আ) তখন পূর্বের ঔষধ সেবন করলেন। কিন্তু ব্যথা তো কমলো না বরং আরো বেড়ে গেল। মহান আল্লাহর দরবারে মুসা (আ) আরজ করলেন- হে আল্লাহ! এ কি রহস্য! ঔষধ এক কিন্তু প্রভাব দু’ধরণের । প্রথমবার এই ঔষধ আরোগ্য দান করল কিন্তু দ্বিতীয় বার রোগ বাড়িয়ে দিল। আল্লাহ বললেন, হে মুসা! সেই বার তুমি আমার পক্ষ থেকে দানার কাছে গিয়েছিলে। আর এবার তুমি তোমার পক্ষ থেকে সেবন করেছ। হে মুসা! শিফা বা আরোগ্য তো আমারই নামের বরকতের মধ্যে নিহিত। আমার নামের বরকত ব্যতীত পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই ধংসকারী বিষতুল্য। আর আল্লাহর নাম হল প্রতিষেধক৷

এক ইহুদী রমনী বিষ মিশ্রিত খাদ্য নবী করীম (সা) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা) কে পরিবেশন করেছিল। মহানবী (সা) তা টের পেয়ে হুকুম দিলেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে খাও। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম (রা) উক্ত গোশত খেলেন কিন্তু তাঁদের কারো কোনো ক্ষকি হয়নি।

হাদীস শরীফে আছে- “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” বলে পানাহার শুরু না করলে শয়তান উক্ত খাদ্যবস্ত নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।

একটি প্রশ্ন

কোনো কোনো লোক বলে থাকেন যে, আমরা হাজার বার “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে থাকি কিন্তু কোন উপকার হয় না। অথচ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ করে বিষ পান করে নিলেন; কিন্তু আমরা “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে কোনো ভারী খাবারও খেয়ে নিলে তাও আমাদের ক্ষতি হয়ে যায়। এর কি রহস্য হতে পারে?

জবাব

সমস্ত দোয়া ও ওজিফা কার্তুজের মতো আর পাঠকের মুখ বা জবান বন্দুকের মতো। কার্তুজ অবশ্যই সিংহকে আঘাত করে। আমরা আমাদের এ জবানে প্রত্যেহ মিথ্যা, গীবত ইত্যাদি করে থাকি সুতরাং সেই প্রভাব কোথা থেকে আসবে? যদি কোরআনুল কারীমের সেই প্রভাব দেখতে চান তাহলে ভাল জবান তৈরি করুন। একটি কথা অতিব সত্য, আর তা হলো- “খোদাকা কালাম হক হ্যায়” অর্থাৎ- আল্লাহর কালাম সত্য। আমরা সত্য নাও হতে পারি।

তাফসীরে নাঈমীতে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তির সামনে কোন কঠিন ও বড় মুছিবত এসে যায় তখন সে নিন্মোক্ত ইবারতটি একটি কাগজে লিখবে-

بسم اﷲ الرحمٰن الرحيم٠ مِنﹶالعبد الذليل اليٰ رب الجليل -اني مسني الضر و انت ارحم الراحمين٠

অর্থাৎ আল্লাহর নামে আরম্ভ যিনি পরম দয়ালু ও করুনাময়। এ ফরিয়াদ অধমের পক্ষ হতে মহান রবের দরবারে এমনি যে, আমি কঠিন বিপদের সম্মুখীন আর তুমি হলে পরম সর্বাধিক দয়ালু। অতঃপর এ লিখিত কাগজের টুকরাটা কোন প্রবাহিত পানির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। অতঃপর নিচের দোয়াটি পড়বে-

اللٰهم بمحمد و اله الطيبين الطاهرين و اصحابه المرسلين٠ اقضي حاجتي يا اكرم الاكرمين٠

অর্থাৎ- হে আল্লাহ! হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর উছিলায় এবং তাঁর পাক-পবিত্র বংশধরদের উছিলায় ও তাঁর প্রতিনিধীত্বকারী সাহাবীদের উছিলায় আমার চাহিদা পূরণ কর! হে সর্বাধিক দয়ালু। (হা-জাতী এর স্থলে আপনার উদ্দেশ্যে কি তা উল্লেখ করতে হবে।)

বিসমিল্লাহ’র বিস্ময়কর প্রভাব:
হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া হয়নি তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৪/৩২৯)

বিসমিল্লাহ একটি শক্তিশালী আমল। এর মাধ্যমে শয়তানের কার্যক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। অকল্যাণ ও অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আবু মুলাইহ থেকে বর্ণিত, তিনি একজন সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি একবার নবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর আরোহীর পেছনে বসা ছিলাম। এমন সময় আরোহী পা ফসকে পড়ে গেল। তখন আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হোক। নবী (সা.) বলেন, ‘শয়তান ধ্বংস হোক এরূপ বোলো না, কেননা এতে সে নিজেকে খুব বড় মনে করে এবং বলে আমার নিজ শক্তি দ্বারা এ কাজ করেছি; বরং এরূপ মুহূর্তে বলবে ‘বিসমিল্লাহ’। এতে সে অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়, এমনকি মাছিসদৃশ হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৯৭৮২)

খাওয়াদাওয়াসহ যেকোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া হলে সেই কাজে শয়তানের অংশীদারি থাকে না। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে খাবারে বিসমিল্লাহ পড়া হয় না, সে খাবারে শয়তানের অংশ থাকে। সেই খাবার মানুষের সঙ্গে শয়তানও ভক্ষণ করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৩৭৬)

অন্য একটি হাদিসে এসেছে ‘শয়তান সেই খাদ্যকে নিজের জন্য হালাল করে নেয়, যে খাদ্যের ওপর বিসমিল্লাহ বলা হয় না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২০১৭)

প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে প্রথম ওহি নাজিলের সময়ও এ উত্তম বাক্য পড়ানো হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘জিবরাঈল (আ.) সর্বপ্রথম মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন, তা হচ্ছে জিবরাঈল (আ.) বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি আশ্রয় চান। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, আমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) বলেন, হে নবী! আপনি বলুন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।’ (তাফসির ইবনে কাসির : পৃষ্ঠা ২৬৩)

‘বিসমিল্লাহ’র মর্যাদা রক্ষা :
দাওয়াতনামা, পোস্টার ও ব্যানার, যা নির্ধারিত সময়ের পর কোনো প্রয়োজন হয় না, আবার প্রয়োজন শেষে পথে-ঘাটে ও নর্দমায় পড়ে থাকে, কিন্তু বর্তমানে বরকত লাভের আশায় সেগুলোতেই আমরা বিসমিল্লাহ লিখে এর অমর্যাদা করছি। মনে রাখতে হবে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম কোরআনের একটি মর্যাদাপূর্ণ আয়াত। কোরআনের অন্য আয়াতের মতো এর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা অপরিহার্য। তাই এসব ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আরবি বাংলা কোনোভাবেই লেখা উচিত নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩২৩)

চিঠিপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখার শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লেখা সুন্নাত। কিন্তু অনেকেই বিসমিল্লাহর পরিবর্তে ৭৮৬ লিখে থাকে। এটা জায়েজ নয়। এতে বিসমিল্লাহর বরকত ও ফজিলত কিছুই পাওয়া যাবে না। এ রীতি পরিহার করা উচিত। কারো কারো ‘বিসমিহি তাআলা’ লেখার অভ্যাস আছে। এতে আল্লাহর নাম স্মরণ করার সওয়াব পাওয়া যাবে, তবে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখার স্বতন্ত্র সুন্নাত আদায় হবে না। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৮/২৪, ফাতাওয়া উছমানি ১/১৬৩)। মোটকথা লিফলেট, পোস্টার বা কোনো ধরনের কাগজের টুকরো, যেগুলো সাধারণত সংরক্ষণ করা হয় না সেসব কাগজে ‘বিসমিল্লাহ’ না লিখে বরং তা আরম্ভ করার সময় শুধু মুখে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করে নিলে এর ফজিলত ও বরকত পাওয়া যাবে। (শরহু মুসলিম নববি : ২/৯৮)

উপসংহার:
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বাসমালাহ‘র হক বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন৷আমীন৷

পড়েছেনঃ 53 জন