Rahmania Madrasah Sirajganj

প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগ আত্বশুদ্ধির জন্য যথেষ্ট নয়, –মাওলানা ইলিয়াস রহ.

শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. কে লেখা এক পত্রে মাও. ইলিয়াস রহ. উল্লেখ করেন, “আমার দীর্ঘ দিনের আকাংক্ষা এই যে, তাবলীগের জামাতগুলো বুযুর্গানে দীনের খানকাগুলোতে গিয়ে খানকার পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করে সেখানকার ফয়েয-বরকতও গ্রহণ করুক। খানকায় অবস্থানের সময়ের ভিতরেই অবসর সময়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে গিয়ে দাওয়াতের কাজগুলোও যেন জারী থাকে। আপনি এই ব্যাপারে আগ্রহী লোকদের সাথে পরামর্শ করে কোন একটি নিয়ম ঠিক করে রাখুন। বান্দাও কিছু সংখ্যক সাথীসহ এই সপ্তাহেই হাজির হয়ে যাবে। দেওবন্দ এবং থানাভবনে যাওয়ারও ইচ্ছা আছে।” [দীনী দাওয়াত: পৃ. ১০১]

দাওয়াত ও তাবলীগের মেওয়াতী সাথীদের প্রতি লেখা এক চিঠিতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. তাদের হিদায়াত দিয়ে লিখেছেন যে, “তাবলীগে বের হওয়ার খোলাসা (সারকথা) তিন জিনিসকে জিন্দা করা: যিকির, তালীম, তাবলীগ। মেরে দোস্তোঁ আযীযোঁ! তোমাদের এক এক বছর সময় লাগানোর সংবাদ পেয়ে আমার যে আনন্দ হয়েছে তা লিখে প্রকাশ করার মতো না। আল্লাহ কবুল করেন এবং আরো বেশি বেশি তাওফীক দান করেন। আমি কয়েকটি বিষয়ে তোমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি: (১) নিজ নিজ এলাকায় যারা আগেই যিকির শুরু করেছে বা এখন করছে বা শুরু করে ছেড়ে দিয়েছে, তাদের তালিকা করে আমাকে বা শাইখুল হাদীস সাহেবকে লিখে পাঠাবে।একটু পর লিখেন, এক নম্বরে উল্লিখিত যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যাদেরকে বার তাসবীহের আমল দেওয়া হয়েছে তারা তা যথারীতি পূর্ণ করছে কিনা? এবং তারা আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে আমল শুরু করেছে ? নাকি নিজেদের সিদ্ধান্তে যিকিরকারীদের দেখে দেখে শুরু করেছে? প্রত্যেকের কাছে জিজ্ঞেস করে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত জানাবে। (২) আর যারা বাইআত হয়েছে, তাদের তালিকা এবং তারা বাইআতের পর যে হিদায়াত দেওয়া হয়েছে, তা পালন করছে কিনা তাও লিখবে। যারা বার তাসবীহের যিকির করছে, তাদেরকে রায়পুর গিয়ে একচিল্লা দেওয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করবে। [ মাকাতিবে হযরত মাওলানা ইলিয়াস ; পৃ. ১৩৬, মেওয়াতিদের প্রতি ১ নং চিঠি]

আর রায়পুর হলো, সাহারানপুর জেলার অন্তর্গত একটি এলাকা, এখানে উদ্দেশ্য, রায়পুরে অবস্থিত হযরত শাহ আব্দুর রহীম সাহেব রায়পুরী রহ. এর খলীফা হযরত মাওলানা আব্দুল কাদের সাহেবে রহ. এর খানকা!হযরত মাও. ইলিয়াস রহ. এর হিদায়াত দ্বারা স্পষ্ট বোঝা য্য়া যে, তিনি প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগকে আত্মশুদ্ধির জন্য মোটেই যথেষ্ট মনে করতেন না; বরং আত্মশুদ্ধির জন্য বুযুর্গানে দীনের খানকায় যাওয়াকে আবশ্যক মনে করতেন। বর্তমানে এ ব্যাপারে গোমরাহী ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, দাওয়াত ও তাবলীগে কয়েক চিল্লা দিয়েই এ মানসিকতা তৈরি হয়ে যায় যে, আমার আত্মশুদ্ধি হয়ে গেছে! অথচ তার এ ধারণা বাস্তবতার বিরোধী বটেই, এমনকি হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গিরও সম্পূর্ণ বিপরীত।সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগানোর পাশাপাশি উলামায়ে কেরামের সংশ্রবে ইলম শিক্ষা করা এবং পীর-মাশায়েখের সোহবাতে থেকে আত্মশুদ্ধির মেহনত করাও একান্ত আবশ্যক। এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। দীনী পরিবেশে যত জায়গায় ফেতনার সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ হলো, দায়িত্বশীল ও সংশ্লিষ্টদের আত্মশুদ্ধি না থাকা। দাওয়াতের এ মেহনতকে উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছে, এ বিশ্বাস নিজের মধ্যে ধারণ করে দাওয়াত ও তাবলীগ সহ সকল দীনী বিষয়ে তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে এবং তাদের সাথে জুড়ে মিলে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, ঐ উম্মাত ধ্বংস হয়ে গেছে, যে উম্মাত তাদের হক্কানী উলামায়ে কেরাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এ কারণেই হযরত আবুল হাসান আলী নদভী রহ. মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে বলেন যে, আওয়াম ও উলামায়ে কেরামের অপরিচয় ও দূরত্ব কিছুতেই তাঁর বরদাশত ছিল না। এটাকে তিনি উম্মতের বিরাট দুর্ভাগ্য, ইসলামের ভবিষ্যতের জন্য বিরাট খাতরা এবং ধর্মহীনতা ও ধর্মদ্রোহিতার পূর্ব লক্ষণ মনে করতেন। [দীনী দাওয়াত; পৃ. ১২২]

উলামায়ে উম্মাতের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকা। তাদের সাথে মুহাব্বাত রাখা এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করা। কেননা, উলামায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ সমস্ত মেহনতকে বরবাদ করে দেয়। এই উম্মাতের কাছে বিশুদ্ধ দীন পৌঁছিয়েছেন উলামায়ে কেরাম। তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নায়েব বা উত্তরাধিকারী। তারা জনগণকে দীন শিক্ষা দেয়ার জন্য পুরো জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছেন। এইজন্য উম্মাত, উলামায়ে কেরামের কাছে ঋণী।উলামাদের এই সহযোগিতা দুনিয়ার মতো আখেরাতেও লাগবে। আখেরাতে যে সমস্ত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ও মাদরাসা-মসজিদের হিতাকাংক্ষীরা নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে যেতে অক্ষম হয়ে যাবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাফেয ও আলেমদের অনুমতি দিবেন। তারা বেছে বেছে সেই সব মানুষদেরকেই জান্নাতে নিবেন, যারা দীনের কল্যাণকামিতায় উলামায়ে কেরামকে মুহাব্বাত করে মাদরাসা-মসজিদের উন্নতি-অগ্রগতিতে এবং দীনী মেহনত ও দীনী প্রতিষ্ঠানের বিপদাপদে পাশে ছিলো আর সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলো। কাজেই জান্নাতে যেতে উলামায়ে কেরামের সাহায্য লাগবে।যারা দীনের মেহনত করেন-চাই তাবলীগের সাথী হোন বা চরমোনাইয়ের কর্মী, কিংবা মাদরাসা-মসজিদের কমিটি- যদি এই মেহনতের পরিণতিতে তাদের মনে উলামাদের প্রতি ইজ্জত ও আযমত এবং মুহাব্বত সৃষ্টি না হয়, তাহলে তার মধ্যে দীন আসে নাই। দীনের যত বড় থেকে বড় মেহনতকারীই হোক না কেন, দিলের মধ্যে যদি উলামায়ে দীনের প্রতি অভক্তি, ঘৃণা ও বিদ্বেষ থাকে, তাহলে তার ঐ মেহনত আর দীনদারীর দুই পয়সারও দাম নেই। ফেতনার সময় যে কোনো মূহুর্তে তা কচুপাতার পানির মতই অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।ঠিক তেমনিভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের বর্তমান পদ্ধতি-যা হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. শুরু করেছেন- নিঃসন্দেহে দীনের একটি মোবারক এবং বড় মেহনত। কিন্তু যদি এ মেহনতের দ্বারা উলামাদের প্রতি ইজ্জত এবং আযমত ও মুহাব্বাত সৃষ্টি না হয়, তবে বুঝতে হবে তার মধ্যে মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর তাবলীগ আসেনি; বরং অন্য কোনো তাবলীগ এসেছে। কেননা, মাওলানা ইলিয়াস রহ. নিজের দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান এবং সারাজীবন তিনি উলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে দাওয়াত ও তাবলীগের এ মোবারক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। হযরতজী ইলিয়াস রহ. এর শায়েখ হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ. বলেছেন, “যারা উলামায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ এবং বদগুমানী পোষণ করে তাদের চেহারা কবরে কুদরতিভাবে কেবলার দিক থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে। যতই তাদের চেহারা কেবলামুখী করা হোক, তা কেবলার দিক থেকে ঘুরে যাবে!”কাজেই অন্তরে উলামায়ে কেরামের প্রতি আযমত এবং মুহাব্বত থাকা দীন এবং ঈমান পরিপূর্ণ থাকার আলামত। আর যদি অন্তরে উলামায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ, আপত্তি এবং ঘৃণা থাকে তাহলে বুঝতে হবে, দীন ও ঈমানের মধ্যে ঘাটতি আছে। সুতরাং অন্তরে উলামায়ে কেরামের প্রতি ঘৃণা এবং আপত্তি থাকলে মৃত্যুর আগে অতিসত্বর তওবা করে সেই আলেমের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেয়া জরুরী এবং আযমত ও মুহাব্বতের সাথে তাদের অনুসরণ ও সহযোগিতা করা অপরিহার্য। অন্যথায় পরিপূর্ণ দীনদার এবং পাক্কা সাচ্চা ঈমানদার হিসেবে দুনিয়া ত্যাগ করার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে! সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভী রহ. বলেন, “মাওলানা ইলিয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদের মধ্যে উলামায়ে কেরামের কোন কথা বা কাজ বুঝে না এলে এর সুব্যাখ্যা গ্রহণ এবং সুধারণা পোষণের অভ্যাস গড়ে তুলতেন।” [দীনী দাওয়াত; পৃ. ১২৩]

হযরতজী এটাও বলেছেন যে, “একজন সাধারণ মুসলমান সম্পর্কেও কোন কারণ ছাড়া বদগুমানী (খারাপ ধারণা পোষণ করা) নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করে। আর উলামায়ে কেরামের উপর প্রশ্ন উত্থাপন (বদগুমানী করা) তো এর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক ও ভয়ংকর। [মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস, মালফুয নং ৫৪]ঘ. দীনী যে কোনো বিষয়ে উম্মাতের মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি হলে, দীনী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তকেই যথার্থ এবং আমলযোগ্য মনে করা। উলামায়ে কেরামের অনুসরণে সকল ফিতনা থেকে হেফাজতের নিশ্চয়তা। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, যারা উলামায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে আযমত ও মুহাব্বত লালন করে এবং উলামায়ে কেরামের জামা‘আতের সাথে জুড়ে তাদের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে তারা ভয়ঙ্কর সব ফিতনা আর দীনের নামে বদদীনী থেকে নিরাপদে এবং হেফাজতে থাকে। পক্ষান্তরে যারা উলামায়ে কেরামের নৈকট্য ও অনুসরণ থেকে বিরত থাকে এবং তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে তারাই ফিতনা এবং গোমরাহীতে লিপ্ত হয়। হযরতজী ইলিয়াস রহ. বলতেন, “প্রত্যেক যুগের সবলোকই নিজেদের বড়দের কাছ থেকে ইলম ও যিকিরের সবক নিতেন এবং তারাও তাদের তত্ত্বাবধানে থেকে এবং তাদের দিকনির্দেশনায় তা পরিপূর্ণ করতেন। এমনিভাবে আজও আমরা আমাদের বড়দের (উলামায়ে কেরাম ও বুর্যাগানে দীন) মুহতাজ। অন্যথায়, ورنہ شیطان کے جال میں پھنس جانے کا بڑا اندیشہ ہے۔শয়তানের জালে আমাদের ফেঁসে যাওয়ার বড়ই আশংকা রয়েছে।” [মালফুযাতে হযরত মাওলানা ইলিয়াস, মালফুয নং ১৩৪]

পড়েছেনঃ 511 জন