Rahmania Madrasah Sirajganj

কাবিননামার ১৮ নং ধারা পূরণে কতিপয় মারাত্মক ভুল, সতর্ক হোন

বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ইং অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ নিবন্ধন করা আবশ্যক। উক্ত আইনে বিবাহ নিবন্ধন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকার নির্ধারিত কাজীকে দিয়ে নির্ধারিত ফরমে বিবাহের নিবন্ধন করতে হয়। যে ফরমে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা হয় সেটিকে ‘নিকাহনামা’ বলা হয়, যা ‘কাবিননামা’ নামেই সমধিক পরিচিত।

উক্ত নিবন্ধন ফরমে মোট ২৪টি ধারা রয়েছে। এসব ধারায় মৌলিকভাবে যে বিষয়গুলো আছে তা হলো, বিবাহের ও নিবন্ধনের স্থান ও তারিখ, স্বামী-স্ত্রীর নাম, পরিচয় ও বয়স, সাক্ষী ও উকিলদের নাম ও পরিচয়, দেনমোহরের পরিমাণ এবং তা নগদ ও বাকির হিসাব, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার প্রদান ও শর্তসমূহের বিবরণ, কাজীর স্বাক্ষর ও সিলমোহর ইত্যাদি। বরকনের ইজাব-কবুলের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর বিবাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী উপরোক্ত তথ্যগুলো দিয়ে কাবিননামা ফরম পূরণ করেন। ফরম পূরণ শেষে বর ও কনে তাতে স্বাক্ষর করেন।

তবে কাবিননামার এসব ধারার মধ্যে স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, ১৮ নং ধারাটি। এতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। আর এটি স্ত্রীর জন্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে খুবই কাজে দেয়। কেননা স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের যখন এতোটা অবনতি ঘটে যে, তাদের পক্ষে একত্রে বসবাস করা কোনোভাবে সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে ওই কষ্টের বেড়াজাল থেকে বের হওয়ার জন্য শরীয়ত স্বামীকে তালাকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর বিধান দিয়েছে।

কিন্তু কোনো স্বামী এ পর্যায়েও যেন তালাকের পথ অবলম্বন না করে স্ত্রীকে আটকে রেখে তার উপর জুলুম নির্যাতন করতে না পারে সেজন্য শরীয়ত ‘তালাকে তাফয়ীয’ এর নিয়ম প্রবর্তন করেছে। অর্থাৎ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের পূর্বানুমতি প্রদান করা; যেন প্রয়োজনবোধে স্ত্রী নিজেই তালাক গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং স্ত্রী বা স্ত্রীপক্ষের জন্য বিয়ের কাবিননামা পূরণের সময় স্বামী থেকে সেই অধিকার নেওয়ার সুযোগ শরীয়তে রয়েছে। ইসলামী আইনের ভাষায় এরই নাম, ‘তালাকে তাফয়ীয’। অতএব মুসলিম পারিবারিক আইনে কাবিননামার মধ্যে ‘তালাকে তাফয়ীয’ এর ধারাটি একটি কার্যকর সংযোজন।

তবে এই ধারাটি পূরণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে অনেক সময়ই বিভিন্ন ধরনের ভুল ও শরীয়ত পরিপন্থী কার্য সংগঠিত হয়ে থাকে। যার ফলে দেখা যায়, বিয়ের পর স্ত্রীরা অহরহ তালাক গ্রহণ করে থাকে। সামান্য কারণে হুট করে স্বামীকে তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দেয়। এরপর নিজেরা আফসোস করে। জরীপে দেখা যায়, গ্রামের তুলনায় শহরে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে তালাক গ্রহণ বা ডিভোর্স প্রদানের ঘটনা বেশি ঘটে। এর থেকে বাঁচার উপায় হলো, সঠিকভাবে এ ধারাটি পূরণ করা। এবং এ সংক্রান্ত যেসব ভুল-ভ্রান্তি রয়েছে তা থেকে বেঁচে থাকা। নিম্নে এ সংক্রান্ত বহুল প্রচলিত ভুলগুলো উল্লেখ করা হলো :

১. তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ :

কাজী বা রেজিস্টাররা অনেক ক্ষেত্রেই এ ধারার ঘরে ‘তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে’ বলে লিখে দেয়। এটি অনেক বড় ভুল। কারণ, এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা অপর্ণ করা হলেই এ ধারার উদ্দেশ্য পরিপূর্ণরূপে হাসিল হয়ে যায়। কিন্তু বিবাহ রেজিস্ট্রার এদিকটি বিবেচনা না করেই তিন তালাকের অধিকারের কথা ড্রাফট করে ফেলে। ফলে এ ক্ষমতাবলে পরবর্তীতে স্ত্রী যখন সামান্য কারণেই তিন তালাক গ্রহণ করে বসে এবং এরপর আবার ঐ স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করতে চায় তখন আর সেই সুযোগ থাকে না।

অতএব ধারাটা এমনভাবে লেখা উচিত, যেন সহজে আসল উদ্দেশ্য হাসিল হয়, আবার অতিরিক্ত ক্ষমতা পাওয়ার কারণে কারো ক্ষতিও না হয়। এজন্য এক্ষেত্রে কেবল ‘এক তালাকে বায়েন’ গ্রহণের ক্ষমতা অপর্ণ করা উচিত। এতে এ ধারার উদ্দেশ্যও হাসিল হবে আবার বিবাহ বিচ্ছেদের পর পুনরায় ঘর-সংসার করতে চাইলে সে সুযোগও বাকি থাকবে। কারণ এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হলে দুই দিকেরই সুযোগ থাকে। স্ত্রী চাইলে ইদ্দতের পর অন্যত্র বিয়ে বসতে পারে। আবার পূর্বের স্বামীর সাথে পুনরায় ঘর-সংসার করতে চাইলে নতুনভাবে আক্দ করে একত্রে থাকাও সম্ভব। অতএব তিন তালাকের অধিকার না দিয়ে এক তালাকে বায়েন গ্রহণের অধিকার দেওয়াই যুক্তিযুক্ত এবং তা এ সম্পর্কিত শরয়ী নির্দেশনারও মোয়াফিক।

২. তালাক গ্রহণের শর্তসমূহ গদবাধা লিখে দেওয়া :

উক্ত ধারায় লেখা আছে, কী কী শর্তে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অপর্ণ করা হয়েছে? এক্ষেত্রে যে সকল শর্ত সাপেক্ষে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করা হয়ে থাকে সাধারণত সেগুলো কাজীরা গদবাধাভাবে লিখে দেয়। এ ব্যাপারে ছেলে বা মেয়েপক্ষের মতামত নেয়া বা শর্তগুলো সুচিন্তিতভাবে লেখার চেষ্টা করা হয় না। এ ধারায় সাধারণত যে শর্তগুলো লেখা হয় তন্মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি শর্ত হলো, ‘বনিবনা না হলে স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে পারবে’।

একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে, শর্তটি খুবই হালকা। অনেকটা বিনা শর্তে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণের নামান্তর। কেননা প্রতিটি বৈবাহিক সম্পর্কেই কিছু না কিছু মনোমালিন্য হয়েই থাকে। মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তরকারিতে লবন কমবেশি বা ঝাল-ঝোল কমবেশি হওয়া নিয়েও মতের অমিল হয়ে থাকে। এসব অমিল বা মনোমালিন্য অস্থায়ী। কিছুক্ষণ পর আবার সব ঠিক হয়ে যায়। তো বনিবনা না হলেই যদি স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া থাকে তাহলে ব্যাপারটি বেশ ঠুনকো এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।

আর এমনিতেই মেয়েদের রাগ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরুষের তুলনায় কম। এজন্য সামান্য কোনো ব্যাপারে সাময়িক মনোমালিন্য হলেও ‘বনিবনা না হলে’ এ শর্তটি পাওয়া যায় এবং তালাক গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে স্ত্রী বলতে পারে যে, এতটুকুতেই স্বামীর সাথে আমার বনিবনা হয়নি তাই তালাক নিয়েছি। অথচ হালকা মনোমালিন্যে স্ত্রীর তালাক গ্রহণের ক্ষমতা সৃষ্টি হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত। কেউ চায় না অল্পতেই তাদের সংসার ভেঙ্গে যাক। কিন্তু উক্ত গদবাধা শর্তের কারণে দেখা যায়, অল্পতেই সংসার চিরতরে ভেঙ্গে যায়। স্ত্রী তিন তালাক গ্রহণ করে বসে। ফলে এরপর একসাথে থাকার আর কোনো সুযোগ বাকি থাকে না।

মনে রাখতে হবে, তালাক গ্রহণ ও প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি এ ধরনের হালকা শর্তে শর্তযুক্ত হওয়া কখনোই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে শর্তগুলো ভালোভাবে চিন্তা করে লেখা উচিত। এমন কিছু ভারসাম্যপূর্ণ শর্তারোপ করা উচিত, যেন স্ত্রী প্রয়োজন ছাড়া সামান্য রাগ হলেই তালাক গ্রহণ না করতে পারে। আবার স্বামী যেন তাকে জুলুম-অত্যাচার করেও আটকে রাখতে না পারে।

৩. তালাক গ্রহণের ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর এখতিয়ারে দেওয়া :

আলোচ্য ধারায় সাধারণত তালাক গ্রহণের ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর এখতিয়ারে দেয়া হয়। তালাক গ্রহণের আগে নিজ অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করার কথা বলা হয় না। এটিও ঠিক নয়। কারণ, স্ত্রী একাকী তালাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তাতে তাড়াহুড়া বা বাড়াবাড়ির প্রবল আশংকা থাকে। তাই তালাক গ্রহণের ক্ষমতাকে অভিভাবকের অনুমতির সাথে শর্তযুক্ত করে দেওয়া বাঞ্চনীয়। কেননা তালাক গ্রহণের আগে স্ত্রী যদি নিজ অভিভাবকের সাথে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করে তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, অভিভাবকদের হস্তক্ষেপে আপোষ মীমাংসায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। তালাক গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন হবে না। এবং এতে পূর্বাপর চিন্তা না করে হুট করে তালাক গ্রহণের পথও বন্ধ হবে।

কুরআন মাজীদে সূরা আহযাবের ‘আয়াতে তাখয়ীর’ (স্ত্রীকে বিবাহবিচ্ছেদের এখতিয়ার দেয়ার আয়াত) নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.কে ‘দুনিয়ার অর্থ-বিত্ত চাও না আমাকে চাও’ এ প্রস্তাব দেয়ার সময় বলেছিলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তুমি তাড়াহুড়ো করো না। তুমি তোমার আববা-আম্মার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিও।

ﻗﺎﻟﺖ ﻋﺎﺋﺸﺔ: ﻓﺄﻧﺰﻟﺖ: ﺁﻳﺔ اﻟﺘﺨﻴﻴﺮ ﻓﺒﺪﺃ ﺑﻲ ﺃﻭﻝ اﻣﺮﺃﺓ، ﻓﻘﺎﻝ: ﺇﻧﻲ ﺫاﻛﺮ ﻟﻚ ﺃﻣﺮا، ﻭﻻ ﻋﻠﻴﻚ ﺃﻥ ﻻ ﺗﻌﺠﻠﻲ ﺣﺘﻰ ﺗﺴﺘﺄﻣﺮﻱ ﺃﺑﻮﻳﻚ

[সহীহ বুখারী, হাদীস : ২৪৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৪৭৫]

উক্ত হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নিজ অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করার কথা বলেছেন। এর থেকে প্রমাণিত হয়, স্ত্রীদেরকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণের সময় ‘অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে’ এ শর্তটি জুড়ে দেয়া উচিত। যেন তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা তাড়াহুড়া না করে, ভুল না করে।

৪. ১৮ নং ধারা পূরণের আগেই বরের স্বাক্ষর নিয়ে নেওয়া :

অনেকে কাবিননামার ধারাগুলো পূরণ করার আগেই সাদা ফরমে দস্তখত করে দেয়। সাধারণত বিবাহের রেজিস্টার বা কাজীরা বরকনে থেকে এভাবে আগেই স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। এরপর তারা ধারাগুলো, বিশেষ করে ১৮ নং ধারাটি নিজেদের মত করে পূরণ করে। এটিও একটি বড় ভুল। এতে ঐ কাবিননামায় বরের স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণের বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হয় না। তাই এ ধারার শর্ত ও তালাক প্রয়োগের ক্ষমতা লেখার সময় বা পরে পাত্রকে অবহিত করেই তার স্বাক্ষর নিবে। এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য রাখা উচিত।

অবশ্য এক্ষেত্রে সাদা ফরমে স্বাক্ষর করার অর্থ যেহেতু ‘ধারাগুলো পূরণ করার ব্যাপারে কাজীকে অনুমতি প্রদান’ তাই ফিকহের দৃষ্টিতে এ স্বাক্ষর গ্রহণযোগ্য। তবে এটি নিয়ম পরিপন্থী এবং অদূরদর্শিতা। কারণ সেক্ষেত্রে কাজীরা নিজেদের মতো করে ধারাগুলো পূরণ করবে, যা অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর স্বার্থ বিরোধীও হয়ে যেতে পারে। অতএব এমনটি না করাই কাম্য।

৫. স্বামীকে তালাক দিলাম বলা বা লেখা :

উক্ত ধারায় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্ত্রী যখন তালাক গ্রহণ করে তখন অনেক ক্ষেত্রে তালাকপত্রে বিষয়টি এভাবে লেখা হয় যে, ‘আমি আমার স্বামী অমুককে তালাক দিলাম’ বা ‘প্রদান করলাম’। এভাবে তালাক দেয়ার পর অনেক সময় স্ত্রী অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার করা আরম্ভ করে। এটি একটি মারাত্মক ভুল। কেননা শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক প্রদানের ক্ষমতা কেবল স্বামীর, স্ত্রীর নয়। তবে স্বামীর দেয়া ক্ষমতাবলে স্ত্রী নিজের উপর তালাক গ্রহণ করতে পারে; স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। এক্ষেত্রে স্ত্রী নিজের উপর তালাক গ্রহণের পরিবর্তে স্বামীকে মৌখিক বা লিখিতভাবে তালাক দিলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা কার্যকর হয় না। বরং তার স্বামীর সাথে তার বিবাহবন্ধন পূর্বের মতোই বহাল থাকে।

সুতরাং উক্ত অগ্রহণযোগ্য তালাকের ভিত্তিতে স্ত্রীর জন্য অন্য পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং ঐ পুরুষের সাথে একত্রে বসবাস করা সম্পূর্ণ হারাম হবে। অতএব ১৮ নং ধারায় উল্লেখিত শর্ত যথাযথভাবে পাওয়া গেলে এবং সবদিক বিবেচনায় বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে স্ত্রী তালাক গ্রহণের কথা এভাবে বলবে বা লিখবে, ‘আমি কাবিননামার ১৮ নং ধারায় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিজ নফসের উপর এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করলাম।’ ‘অমুককে তালাক দিলাম’ বা ‘ডিভোর্স দিলাম’ এধরনের শব্দ বলবে না এবং লিখবেও না। এ ক্ষেত্রে উকিল বা তালাক রেজিস্টারদের তালাকপত্র লেখার সময় বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি।

عن منصور ، عن اﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ: ﻓﻲ ﺭﺟﻞ ﻗﺎﻝ ﻻﻣﺮﺃﺗﻪ: ﺃﻣﺮﻙ ﺑﻴﺪﻙ ﻓﻘﺎﻟﺖ: ﺃﻧﺖ ﻃﺎﻟﻖ ﺛﻼﺛﺎ، ﻓﻘﺎﻝ اﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ: ﺧﻄﺄ اﻟﻠﻪ ﻧﻮﺃﻫﺎ، ﻟﻮ ﻗﺎﻟﺖ: ﺃﻧﺎ ﻃﺎﻟﻖ ﺛﻼﺛﺎ ﻟﻜﺎﻥ ﻛﻤﺎ ﻗﺎﻟﺖ.اه‍

তাবেয়ী মানসূর রহ. বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলেছে, তোমার তালাক গ্রহণের ক্ষমতা তোমার হাতে। একথা শুনে স্ত্রী বলল, আপনি তিন তালাক। এ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, আল্লাহ তাআলা তাকে বৃষ্টি না দিন (অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য সফল না হোক)। যদি সে (ঐভাবে না বলে) বলতো, ‘আমি তিন তালাক’ তাহলে যা বলেছে তাই হতো।’
[মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৯/৫৮২; মাবসূতে সারাখসী ৩/৬৪; আল-ইখতিয়ার লিতা‘লীলিল মুখতার ৩/১৩৬; আলবাহরুর রায়েক ৩/৩৪৩; আদ্দুররুল মুখতার ৩/৩২৫-৩২৬; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩২৪; বাদায়েউস সানায়ে ৩/১৮৭]

প্রকাশ থাকে যে, আমাদের দেশের কাবিননামার উক্ত ধারার ভাষ্যটিও সঠিক নয়। কেননা তাতে লেখা আছে, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে? সম্ভবত এখান থেকেই উক্ত ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দিলে স্ত্রী স্বামীকেই তালাক দিতে পারে। এখানে কথাটা এভাবে লেখা উচিত ছিল যে, ‘স্বামী স্ত্রীকে নিজ নফসের উপর তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অপর্ণ করিয়াছে কি না? অথবা এভাবেও লেখা যেতো, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করিয়াছে কি না?’ পারিবারিক আদালতের এ বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত।

উল্লেখ্য যে, আলোচ্য ক্ষেত্রে কোনো কোনো সাহাবী ও তাবেয়ী থেকে এক তালাক কার্যকর হওয়ার কথাও বর্ণিত আছে, যদিও হানাফী মাযহাবের ফতোয়া এর উপর নয়। কিন্তু সাহাবী ও তাবেয়ীর উক্ত অভিমতের কারণে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। তাই কোনো স্ত্রী যদি কাবিননামার ক্ষমতাবলে গলদভাবে নিজে তালাক গ্রহণ না করে স্বামীকে তালাক দেয়, এরপর তারা পুনরায় একত্রে ঘর-সংসার করতে চায় তবে সতর্কতামূলক বিবাহ দোহরানো উচিত।

৬. ১৮ নং ধারায় শুধু ‘হ্যাঁ’ শব্দ লেখা :

অনেকে কাবিননামার ১৮ নং ধারায় শুধু ‘হ্যাঁ’ শব্দটি লিখে দেয়। এটাও ভুল। কেননা এতে স্ত্রী নিঃশর্তভাবে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। আর স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান যদিও শর্তযুক্ত বা শর্তহীন দুভাবেই হতে পারে; কিন্তু নিঃশর্ত ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে যেহেতু ঝুঁকি রয়েছে তাই এমনটি করা আদৌ ঠিক নয়। সুতরাং এতে ভারসাম্যপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা বাঞ্চনীয়।

৭. ১৮ নং ধারাটি খালি রেখে দেওয়া :

অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ নং ধারাটি পূরণ না করে ফাকা রেখে দেওয়া হয়। এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ, মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইনে যে ৯টি কারণে বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতির কথা বলা আছে তার কোনোটি না থাকলে এবং খুলার মাধ্যমেও স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ না পেলে একজন স্ত্রীর পক্ষে বিবাহবন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ নং ধারায় স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ না করে তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক গ্রহণ করতে পারে না। অথচ স্বামীর প্রতারণা বা জুলুমের কারণে স্ত্রীর কখনো তালাক গ্রহণের মাধ্যমে নিজ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর প্রয়োজন হয়।

উক্ত অসুবিধার কথা চিন্তা করেই মূলত কাবিননামায় ১৮ নং ধারাটি সংযোজন করা হয়েছে। যাতে স্ত্রী অপেক্ষাকৃত কম জটিলতায় তালাকে তাফয়ীযের মাধ্যমে মুক্তি পেতে পারে। এজন্য উক্ত ধারাটি পূরণ করা উচিত। অনেকে এ বিষয়টি সম্পর্কে না জানার কারণেও ধারাটি শূন্য থাকে। তাই কাবিননামা পূরণের সময় কাজীদের অবশ্যই দু’পক্ষকে এই ধারা সম্পর্কে বিশেষভাবে জানানো উচিত।

৮. বিয়ের আগেই কাবিন করে ফেলা :

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বিয়ের বহু আগেই অনেকে কাবিন করে রাখে। আবার অনেক সময় সরকারি কাজী বিয়ের মজলিসে ইজাব-কবুল সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই সময় না থাকা বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে কাবিনের ফরম পূরণ করে ফেলে এবং বরকনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। এটা নিতান্ত ভুল কাজ। কেননা কাবিননামা হলো, প্রচলিত আইন অনুসারে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন। তাই শরীয়তের বিধান হলো, কাবিন করতে হলে পূর্বে নিয়মমাফিক বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। তারপর নির্ধারিত কাবিননামা ফরম পূরণ করবে। এ সংক্রান্ত সরকারি আইনও একথাই বলে যে, বিবাহের পরে ফরমটি পূরণ করত সংঘটিত বিবাহকে সরকারী রেজিস্টারভুক্ত করবে। কেননা বিয়েই যদি সম্পাদিত না হয়ে থাকে তাহলে রেজিস্ট্রেশন ও নিবন্ধন কিসের হবে? সুতরাং বিয়ের আগে কাবিন করা একে তো আইনসিদ্ধ নয় দ্বিতীয়ত এক্ষেত্রে আরো কিছু বড় বড় সমস্যা রয়েছে।

যেমন, কাবিননামার যে ফরমটি পূরণ করতে হয় তাতে অনেকগুলো ধারা রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি হলো, কত তারিখে বিয়ে সম্পাদিত হয়েছে? কোথায় বিবাহ পড়ানো হয়েছে? বিবাহ কে পড়িয়েছেন? বিয়ে পড়ানো ছাড়া কাবিন করা হলে ফরমের এ ধারাগুলোতে মিথ্যা তথ্য লিখতে হয়। কেননা বিয়ে না হওয়ায় বিয়ে সম্পাদনের তারিখ, স্থান ও বিয়ে পড়ানেওয়ালা সবকিছু বানিয়ে লিখতে হবে। এক কথায়, বিয়ের আগে কাবিন করার দ্বারা পাত্র-পাত্রী, সাক্ষী, শনাক্তকারী, সরকারি নিবন্ধক কিংবা কাজী সবাই মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। সবাই মিথ্যা কথার উপর স্বাক্ষর করছে।

উপরোক্ত মিথ্যা তথ্য লেখা ছাড়াও বিয়ের আগে কাবিন করার ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতর সমস্যা হচ্ছে, কাবিননামার ১৮ নং ধারা পূরণের মাধ্যমে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা। বিয়ের পর যেমনিভাবে স্বামী নিজে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের অধিকার লাভ করে তদ্রূপ স্ত্রীকেও তালাক গ্রহণের অধিকার দিতে পারে। কিন্তু বিয়ের আগে যেহেতু স্বামী নিজেই তালাক প্রদানের অধিকার রাখে না তাই স্ত্রীকেও সেই অধিকার দিতে পারে না। দিলেও স্ত্রীর জন্য উক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেননা বিবাহ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বামী তার স্ত্রীর জন্য পরপুরুষ। আর কোনো পরপুরুষ তো পরনারীকে তালাক দিতে পারে না। দিলেও তা অনর্থক ও অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়।

অতএব পাত্র যদি বিয়ের আগে কাবিননামার ফরম পূরণ করত তাতে স্বাক্ষরও করে তবুও এর দ্বারা বিবাহের পর পাত্রী তালাক গ্রহণের অধিকার প্রাপ্ত হবে না। এমতাবস্থায় স্ত্রী যদি সেই অধিকার বলে কোনোদিন নিজের উপর তালাক গ্রহণ করে তবে তার তালাকগ্রহণ শরীয়ত মতে শুদ্ধ হবে না। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, বিয়ের আগে করা কাবিনের ভিত্তিতেই স্ত্রী ডিভোর্স নিয়ে নেয় এবং অন্যত্র বিবাহও করে ফেলে। অথচ তার ডিভোর্স গ্রহণ কার্যকর না হওয়ায় অন্যত্র বিবাহ বসা বৈধ হয় না। এক্ষেত্রে ডিভোর্স নেওয়ার পরও সে পূর্বের স্বামীরই স্ত্রী থেকে যায়।

বিয়ের আগে কাবিন করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় খারাবী হলো, অনেকে এই কাবিনকেই বিবাহ মনে করে। ফলে মৌখিকভাবে বিয়ের ইজাব-কবুল না করে শুধু কাবিন করার দ্বারাই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেছে বলে ধরে নেয়। অথচ মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু কাবিন করার দ্বারা কখনোই বিবাহ সংঘটিত হয় না। ফলে ছেলেমেয়ের একত্রে থাকাও বৈধ হয় না। এছাড়া অনেকে কাবিনকে বিবাহ মনে না করলেও কাবিন করার পর ছেলেমেয়ের পরস্পর কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাত, একসাথে চলাফেরা ও নির্জনে সময় কাটানো ইত্যাদিকে বৈধ মনে করে। অথচ নিয়মতান্ত্রিক বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে এসবের কোনোটিই বৈধ নয়।

তাই সার্বিক বিবেচনায় ইসলামী শরীয়ত ও সরকারি আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল কাবিননামার ফরম পূরণ করতে হবে, বিয়ের আগে নয়। কখনো যদি বিয়ের আগে ফরম পূরণ করে ফেলা হয় তবে বরের স্বাক্ষর যেন বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরেই নেয়া হয়। আর যদি বরের স্বাক্ষরও বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগেই নিয়ে নেয়া হয় তবে বিয়ের পর অন্তত ১৮ নং ধারাটি সম্পর্কে বরকে অবগত করে তার অনুমোদন ও পুনঃস্বাক্ষর নেওয়া জরুরি।

কাবিননামা পূরণে ভুল-ভ্রান্তির কারণ :

কাবিননামা পূরণে উপরে বর্ণিত ভুলগুলো সাধারণত তিন কারণে হয়ে থাকে। যথা-

১. এবিষয়ে মানুষের জানার অভাব। অনেকে বিয়েতে কাবিননামা পূরণের বিষয়টিকে একটা গতানুগতিক প্রথা বলে মনে করে। এর গুরুত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। এজন্য কাজীরা যেভাবেই কাবিনের ফরম পূরণ করুক না কেন, পাত্র বা পাত্রপক্ষ উক্ত ফরমটি একটু পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করে না; বরং কাজী সাহেব বরের সামনে ফরমটি পেশ করে স্বাক্ষর করতে বললে বর তাতে সম্পূর্ণ মুখস্থ স্বাক্ষর করে দেয়।

২. বিয়ের সময় সাধারণত পাত্ররা স্বভাবজাত লজ্জা ও সংকোচ বোধ করে। সমাজপ্রথায়ও বিয়ের মজলিসে পাত্রের কথা বলাকে দোষের বিষয় মনে করা হয়। ফলে কাজীরা কাবিননামায় পাত্রের মতের বিপরীত কোনো কথা লিখলেও সে তার প্রতিবাদ করে না। এবং তা সংশোধন করতেও বলে না।

৩. অনেক কাজী কাবিননামার কলামগুলো পূরণের জন্য নিজে থেকে একটা গদবাধা ভাষ্য তৈরি করে নেয়। বিশেষ করে ১৮ নং কলামটি পূরণের ক্ষেত্রে তো কেউ কেউ নির্দিষ্ট বাক্য সম্বলিত সিলমোহরও বানিয়ে নেয়। এরপর ঢালাওভাবে সকল কাবিননামায় ওই গদবাধা ভাষ্যই ব্যবহার করে। কোনো বর যদি এর বিপরীতে তার নিজের দেয়া কোনো কথা লিখতে বলে তখন কাজীরা তা লিখতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে, এভাবে লেখা নিয়ম না। আমি এভাবে লিখতে পারবো না। অন্যান্য কাবিনে যা লিখি আমাকে তা-ই লিখতে হবে।

কাজীদের উক্ত কথা সম্পূর্ণ ভুল। কাবিননামার ধারাগুলো বিশেষত ১৮ নং ধারাটি দেওয়াই হয়েছে বর ও কনের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের মতো করে লেখার জন্যে। কাজীদের ইচ্ছা অনুযায়ী লেখার জন্য নয়। কারণ কাবিননামার নিয়মটি বিধিবদ্ধ হয়েছে বর ও কনের স্বার্থ রক্ষার জন্য। সুতরাং তারা কী লিখবে এবং কীভাবে লিখবে- এব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা যা লিখলে এবং যেভাবে লিখলে নিজেদের স্বার্থের পক্ষে অনুকূল হবে বলে মনে করবে তারা তা-ই লিখতে পারবে। এতে কাজীদের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই।

আর এক্ষেত্রে সকলের জন্য একই কথা বা একই ভাষ্য ব্যবহার করার কোনো নিয়ম বা বিধান সংবিধানে নেই। এগুলো সব কাজীদের মনগড়া নিয়ম। যদি সংবিধানে সকলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ্য কোনো কথা নির্ধারিত থাকতো তাহলে সেই কথাটি ফরমে ছাপানোই থাকতো। সেক্ষেত্রে ‘কি না?’ ও ‘কী কী?’ এজাতীয় স্বাধীনতাসূচক শব্দ লেখা থাকতো না।

জরুরি পরামর্শ :

কাবিননামা সঠিকভাবে পূরণের মধ্যে যেহেতু বরকনের ভবিষ্যত জীবনের বহু সুবিধা-অসুবিধার বিষয় নিহিত রয়েছে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে নিখুঁতভাবে এটি পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে ১৭ ও ১৮ নং কলামদুটি ভালো করে দেখে এবং ভেবে-চিন্তে পূরণ করা জরুরি। আর বিয়ের মজলিসে যেহেতু ১৮ নং ধারার বিষয়বস্তু তথা ‘স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান প্রক্রিয়া’ নিয়ে সবিস্তারে কথা বলা যায় না বা বিয়ের মুহূর্তে তালাকের বিষয়ে কথাবার্তা বলাকে অনেকে পছন্দও করে না তাই মজলিসের আগেই পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের পারষ্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে নেওয়া উচিত। এরপর সেই ভিত্তিতে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর কাজীকে দিয়ে কাবিননামা পূরণ করিয়ে নিবে।

তবে কখনো যদি কাজী নিজে থেকে আগেই কাবিননামা ফরমটি পূরণ করে ফেলে তাহলে সেটি ভালোভাবে পড়ে দেখতে হবে। যদি অসঙ্গত কোনো কথা লেখা থাকে তাহলে তা কেটে দিয়ে বা সংশোধন করে স্বাক্ষর করবে। এক্ষেত্রে লজ্জা-সংকোচ করা ঠিক হবে না।

১৮ নং ধারা পূরণের সঠিক পদ্ধতি :

স্ত্রী যেন নিজের উপর তালাক প্রয়োগে তাড়াহুড়া না করে ভেবে-চিন্তে তালাক গ্রহণ করতে পারে এবং পরে যেন তাকে আফসোস করতে না হয় সেজন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাষায় ধারাটি পূরণ করা উচিত। যেন প্রয়োজন ছাড়া সামান্য রাগ হলেই স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে না পারে। আবার স্বামীও যেন স্ত্রীকে আটকে রেখে জুলুম নির্যাতন না করতে পারে। উক্ত বিবেচনায় ধারাটি পূরণের সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরী :

ক. সর্বোচ্চ এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা।

খ. উক্ত ক্ষমতার বাস্তবায়ন স্ত্রীর অন্তত একজন অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে হওয়ার শর্ত আরোপ করা।

গ. তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণটি সুচিন্তিত শর্তসাপেক্ষে হওয়া। প্রচলিত হালকা ও গদবাধা শর্তে না হওয়া।

ঘ. কাবিননামার সকল ধারা বিশেষত ১৮ নং ধারাটি পূরণ করার পরেই বরের স্বাক্ষর করা।

তালাক গ্রহণের পর্যায় ও পরিস্থিতি :

উপরোক্ত চারটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখেই আমাদের আলোচ্য ধারাটি পূরণ করা উচিত। সামনে ১৮ নং ধারা পূরণের একটি প্রস্তাবিত নমুনা পেশ করা হবে। তবে তার আগে তালাক গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর্যায় ও পরিস্থিতিটা একটু উল্লেখ করা দরকার। আর তা হলো, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিরোধ যদি এ পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা একে অপরের হক্ব কোনোক্রমেই যথাযথভাবে আদায় করতে পারছে না তাহলে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের নিয়ে প্রথমে সমঝোতা বৈঠক করতে হবে। এতে যদি উভয়কে মিলিয়ে দেয়া সম্ভব হয় তাহলে তো অনেক ভালো। অন্যথায় পাত্রী পক্ষের এক বা একাধিক অভিভাবক যদি তাদের একত্রে অবস্থানের চেয়ে পৃথক হয়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করেন তবে তখন স্ত্রী নিজ নফসের উপর কেবল এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করবে।

১৮ নং ধারা পূরণের প্রস্তাবিত নমুনা :

সংক্ষেপে ধারাটি এভাবে লেখা যেতে পারে-
‘হ্যাঁ, এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হলো, এই শর্তে যে, স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে এবং উভয় পক্ষের অন্তত একজন করে অভিভাবক যদি এ ব্যাপারে একমত হন যে, এ দম্পতির একত্রে থাকার চেয়ে বিচ্ছেদই শ্রেয় তখন স্ত্রী তাদের লিখিত অনুমোদন সাপেক্ষে নিজ নফসের উপর এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করতে পারবে।’

প্রকাশ থাকে যে, স্ত্রী কর্তৃক তালাক গ্রহণের ব্যাপারে অভিভাবকের অনুমতি লিখিত হওয়া এ জন্য শর্ত করা হয়েছে যে, পরবর্তীতে যেন এ ব্যাপারে ফতোয়া বা রায় পেতে কোনো ঝামেলা না হয়।

উপরোক্ত নিয়মে ধারাটি পূর্ণ করলে যে ফায়দা হবে তা হলো, তালাক গ্রহণে তাড়াহুড়া হবে না। কেবল এক তালাকে বায়েন গ্রহণের কারণে পরবর্তীতে পুনরায় একসাথে থাকার সুযোগও বাকি থাকবে। অতএব এ ব্যাপারে সকলেরই সচেতন হওয়া জরুরী। বিশেষ করে যারা বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন বা বিবাহ পড়ান তাদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরী। তাদের অসচেতনতার কারণে অনেক সংসার অল্পতেই ভেঙ্গে যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

পড়েছেনঃ 532 জন