Rahmania Madrasah Sirajganj

আযাদী মুসলমান এবং ইসলামের ইজ্জত রক্ষায় করেছি, মন্ত্রী হওয়ার জন্য করিনি, –হযরত মাদানী রহঃ

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক হযরত মাওঃ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ) জেলখানায় এবং জজের শুনানি। হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর সর্বপ্রথম ঘোষণা ছিল, ইংরেজ বেনিয়াদের অধীনে চাকরি করা হারাম। এই ফাতাওয়া দেওয়ার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো। গ্রেপ্তার করার পর তাকে করাচির জেলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। মোকাদ্দমা চলতে থাকল। এর ফায়সালা জেলখানায় হবে, আদালতেও হবে না। বরং এর ফায়সালা শোনানো হবে করাচি থেকে দূরে এক ধু ধু ময়দানে। চতুর্দিকে কাঁটাতারের ঘেরাও দিয়ে এজলাস বসানো হলো। যাতে দূর থেকে লোকেরা দেখতে পায়। চতুর্দিকে কামান আর বন্দুক নিয়ে সশস্ত্র ফৌজ উপস্থিত। লক্ষ লক্ষ লোক একত্রিত হয়ে দূর থেকে দেখতে ছিল। তাদের মধ্যে এ কথা প্রচার পেল যে আজ হোসাইন আহমদ মাদানীকে ফাঁসি দেওয়া হবে। হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর উকিল এসে তাঁকে বললেন হুজুর, আপনি শুধু এ কথা বলে দেবেন যে এই ফাতাওয়া আমি দিইনি। তখন তো ইনশাআল্লাহ আপনার রেহাই হয়ে যাবে। অন্যথায় রেহাইয়ের কোনো পরিস্থিতি নেই বরং ওই স্থানেই আপনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। হযরত মাদানী (রহ.) তাঁকে কিছুই বললেন না। এজলাস আরম্ভ হলো। মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার বিভিন্ন আয়োজন করা হলো। হাজারো সশস্ত্র ফৌজ অগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। হাজারো ফৌজকে হযরত হোসাইন আহমদ মাদানীর পেছনে নিয়োগ করা হয়েছে। ফৌজের গাড়িবহরের সামনে হযরত মাদানী (রহ.)-কে উঠানো হলো। তারা এমন একটা ধারণা দিতে চাচ্ছিল যে, হোসাইন আহমদ মাদানী একজন বড় আসামি। তাঁর আজ সর্বোচ্চ সাজা হবে। যাতে মুসলমানগণ ভীতি-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জজ ছিলেন ইউরোপিয়ান। এজলাস বসল। জজ সাহেব হযরত মাদানী (রহ.)-এর উকিলকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার মুয়াক্কেল থেকে জিজ্ঞেস করুন যে, ইংরেজদের অধীনে মুসলমানদের চাকরি করার ফাতাওয়া তিনি দিয়েছেন কি না? হযরত মাদানী (রহ.) জজের প্রশ্ন বুঝে ফেলেছেন। তখন তিনি নিজেই জজের সামনে জবাব দিতে আরম্ভ করলেন। তখন হযরত মাদানী (রহ.) তিনটি বাক্য বলেছেন। ১। আমি এই ফাতাওয়া দিয়েছি। ২। এখনো এই ফাতাওয়া দিচ্ছি। ৩। যদি আগামীতে বেঁচে থাকি তখনও ইনশাআল্লাহ এই ফাতাওয়া দেব। ইংরেজদের অধীনে মুসলমানদের চাকরি করা হারাম। অতঃপর বললেন, আমাকে জানানো হয়েছে যদি আমি এরূপ বলে থাকি তবে আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে, গুলি করা হবে। তখন তিনি শেরওয়ানির বোতাম খুলে দিলেন এবং বললেন, হোসাইন আহমদের বক্ষ উন্মুক্ত আছে। হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) সেদিন শেরওয়ানির যে বোতামগুলো খুলে ছিলেন, তাঁর ইন্তিকাল পর্যন্ত এই বোতাম আর বন্ধ করেননি। বরং বুক সব সময় খোলা ছিল ।হযরত মাদানীর ব্যাপারে জজের শুনানি। জজ সাহেব যে ফয়সালা লিখলেন তাতে লিখলেন, এই মোজাহিদ শুধু ধর্মীয় নেতা নন বরং পুরো দেশের জন্য একজন বড় আমানত। জাতীয় নেতা এবং কায়েদে আজম। জাতির জন্য বড় ভাণ্ডার। তাঁর জীবন দীর্ঘ হওয়ার প্রয়োজন আছে। তাই তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো যাবে না। তবে যেহেতু এরূপ ফাতাওয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় অপরাধ তাই তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।উপমহাদেশ থেকে ইংরেজদের বিতাড়নের জিহাদে? ইংরেজ সরকার মুসলমানদের ইসলাম থেকে বের করার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিল। কাদিয়ানী ইংরেজ ষড়যন্ত্রের ফসল। ওয়াহাবীরা ইংরেজ ষড়যন্ত্রের ফসল। এসব ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায়ও দেওবন্দীরা ছাড়া ময়দানে কারা ছিল? হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) ময়দানে নেমেছিলেন। হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী ময়দানে নেমেছেন। কাদিয়ানীদেরকে উপমহাদেশ থেকে বিতাড়িত করা হলো। হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দীর শাগরেদ হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরী (রহ.), মুফতী মাহমুদ সাহেব (রহ.) পাকিস্তান সরকারের মাধ্যমে কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করিয়েছিলেন। উদ্ভাদ আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন, আর ছাত্রগণ তাতে পূর্ণতা দান করেছেন। হযরত কাসেম নানুতবী (রহ.) ও এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী (রহ.) ইংরেজ খেদাও আন্দোলন শুরু করেছিলেন আর হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর হাতে তা পূর্ণতা লাভ করেছে। এই ইংরেজদের মাধ্যমে উপমহাদেশে গাইরে মুকাল্লিদের ফিতনার অনুপ্রবেশ করেছিল। কারণ এখানে সকল মুসলমানই মুকাল্লিদছিলেন। বিশেষ করে ৯৯ শতাংশ মুসলমানই হানাফী। ইংরেজ ষড়যন্ত্রে সৃষ্ট গাইরে মুকাল্লিদদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.) মাঠে নামলেন। তাঁর যৌক্তিক কর্মপন্থায় গাইরে মুকাল্লিদগণ এমনভাবে ঘরে প্রবেশ করে ছিলেন যে, শত বছর ঘর থেকে বের হতে আর সাহস করেনি। সম্প্রতি সৌদির অর্থায়নে তারা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সুতরাং আকাবীরদের আমানত হিসেবে তাদের মোকাবেলাও দেওবন্দীদেরই ময়দানে আসতে হবে।যখন ইংরেজ এখান থেকে বিতাড়িত হলো, দেশ বিভক্ত হলো, হিন্দুস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন হযরত মাদানী (রহ.)-কে এমন একটি উপাধি দেওয়া হলো, যা রাষ্ট্রপ্রধানদেরও দেওয়া হয় না। ৬টায় রেডিওতে তা ঘোষণা করা হলো, ১১টায় অত্যন্ত বিনয়ের সহিত এর জবাব এলো যে, হযরত মাদানী (রহ.) এই উপাধি নাকচ করে দিয়েছেন এবং বলেছিলেন, হিন্দুস্তানে ইংরেজ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্য কোনো উপাধি পাওয়া নয় বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই উদ্দেশ্য ছিল। যদিও কিছুদিনের জন্য হিন্দুস্তানের মুসলমানদের কষ্ট হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ কিছুদিনের মধ্যে আল্লাহ তা’আলাহ এর মাধ্যমে পুরো দুনিয়ার মুসলমানদের আজাদ করে দেবেন।নকশে হায়াত কিতাব (যা তিনি ভারত বিভক্তির পূর্বে লিখেছেন) তাতে হযরত মাদানী (রহ.) লেখেন, একবার যদি হিন্দুস্তান আজাদ হয়ে যায় তবে পুরো দুনিয়ার মুসলমানদের আজাদী মিলবে। তেমনি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ পূর্ব-পশ্চিমে অনেক দেশ আজাদ হয়েছে। আবার হযরত মাদানীই (রহ.) লিখেছেন, যদি ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান হয় তবে সেই পাকিস্তান হবে আমেরিকার বাণিজ্যকেন্দ্র মুসলমানদের কোনো লাভ হবে না। এ কথা তিনি তখন বলেছিলেন, যখন পাকিস্তান অস্তিত্ব লাভ করেনি। বরং স্লোগান চলছিল মাত্র। সেরূপ অনেক ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর কিতাবে রয়েছে। যাহোক, ভারত স্বাধীন হলো, পাকিস্তানও হলো।ভারতে যখন সংসদ গঠন হচ্ছিল তখন হযরত মাদানী (রহ.)-এর সামনে আর্জি পেশ করা হলো, হযরত! আপনি তাশরীফ আনেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় আপনাকে সোপর্দ করতে চাই। হযরত মাদানী (রহ.) তৎক্ষণাৎ বলেছিলেন, হিন্দুস্তানকে আজাদ করার জন্য যে সামান্য খিদমাত আঞ্জাম দিয়েছি তা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্যই করেছি। পুরো দুনিয়ায় মুসলমানদের আজাদী এবং মুক্তির জন্য করেছি। মুসলমান এবং ইসলামের ইজ্জত রক্ষায় করেছি। মন্ত্রী হওয়ার জন্য করিনি।

পড়েছেনঃ 41 জন